সা ক্ষা ৎ কা র

ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দর না দিলে সংকট হবে

দেলোয়ার হোসেন

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০১৯      

কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। পশুর চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম পবিত্র ঈদুল আজহা। এবার ঈদে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ও সংগ্রহ পরিস্থিতি এবং বর্তমানে এ খাতের অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরাজ শামস

সমকাল :চামড়া খাতের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে?

দেলোয়ার হোসেন :বর্তমানে চামড়া খাতের অবস্থা বেশ খারাপ। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে রফতানিতে ভাটা পড়েছে। একই সঙ্গে ট্যানারি মালিকরা সেখানে নতুন বিনিয়োগ করে অর্থ সংকটে থাকায় আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করছেন না। গত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে তারা অর্থ সংকটের কথা বলে বিপুল টাকা বকেয়া রেখেছেন। ট্যানারি মালিকরা টাকা না দিলে চামড়া কেনা মুশকিল। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও তাদের কাছ থেকে টাকা বের করা যাচ্ছে না। সাধারণত কোরবানির পশুর চামড়া মানে ভালো হয়। বছরের সরবরাহের বেশির ভাগই আসে এ সময়। কোরবানির জন্য সবাই বাছাই করা গরু কিনে থাকেন বলে ভালো চামড়াও পাওয়া যায়। এ কারণে বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এই চামড়ার দামও হয় বেশি। বরাবরের মতো এবারও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই কম দামে কেনার সুযোগ নেই। তবে ট্যানারি মালিকরা এখন টাকা না দিলে আড়তদাররা কতটুকু কিনতে পারবেন সেটা বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমকাল :আপনাদের প্রস্তুতি কেমন? ব্যাংক থেকে নিশ্চই ঋণ পেয়েছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা।

দেলোয়ার হোসেন :ঈদের সময়ে চামড়া কেনায় সরাসরি ঋণ সুবিধা পান না আড়তদার চামড়া ব্যবসায়ীরা। তবে বছরজুড়ে বন্ধকি ঋণ নিয়ে থাকেন তারা। ওই অর্থবছরের এ সময়ে তেমনটা মজুদও থাকে না। তাই ঋণ নিয়ে কোরবানির চামড়া কেনার সুবিধা মেলে না। সহজ শর্তে ও স্বল্পমেয়াদে ঋণ পেলে তা চামড়া কেনাকাটায় কাজে আসত। এ সুবিধা শুধু ট্যানারি মালিকরা ভোগ করেন। তারা এবারও বড় অঙ্কের ঋণ পেলেও আড়তদারদের টাকা তেমন পরিশোধ করেননি। ফলে চামড়া কিনতে আড়তদারদের টাকার সংকট থেকেই যাচ্ছে।

সমকাল :এবার অনেকটা কমিয়ে দর নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল আপনাদের। শেষ পর্যন্ত গতবারের দরই চূড়ান্ত করা হয়। এ দর কতটা যৌক্তিক মনে করেন? গড়ে একটি চামড়ার দর কত হতে পারে?

দেলোয়ার হোসেন :বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে যে দর নির্ধারণ করা হয়েছে তা ঠিকই আছে। এ দর অনুযায়ী চামড়া সংগ্রহের পর ট্যানারি মালিকরা যথাযথ দর না দিলে সংকট তৈরি হবে। একটি গরুর চামড়া কেনার পরে তা সংরক্ষণে অন্তত ১০০ টাকার লবণ দিতে হয়। এর সঙ্গে গুদাম ভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি যোগ করলে প্রতিটি চামড়ায় বাড়তি ২০০ টাকা খরচ যোগ হয়। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ মুনাফা ধরে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন আড়তদাররা। এবারের নির্ধারিত দরে চামড়া কিনলে গড়ে রাজধানীতে একটি গরুর চামড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হবে। ট্যানারি মালিকদের কাছে তা এক হাজার ৩০০ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি করা গেলে আড়তদাররা সন্তুষ্ট থাকবেন।

সমকাল :এবার চামড়া কেনায় কেমন প্রতিযোগিতা হবে মনে করছেন? ট্যানারি মালিকদের কাছে আপনাদের পাওনা কত?

দেলোয়ার হোসেন :অর্থ সংকটের কারণে চামড়া কেনাবেচায় এবার তেমন প্রতিযোগিতা হবে না। কেননা ট্যানারি মালিকদের বেশির ভাগই অর্থ পরিশোধ করেননি। ট্যানারি মালিকদের কাছে মোট পাওনা গিয়ে ঠেকেছে ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকায়। গুটিকয়েক ট্যানারি শুধু সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেছে। কিছু ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা দিয়েছে। বাকি ট্যানারির সঙ্গে যোগাযোগ করেও টাকা মেলেনি। ব্যাংকিং চ্যানেলে দেনা-পাওনার লেনদেন গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। নগদে কিছু টাকা পাওয়ার চেষ্টা এখনও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে টাকা না পাওয়ায় চামড়া কেনা নিয়ে আড়তদাররা দ্বিধায় পড়েছেন।

সমকাল :ট্যানারি মালিকরা এবার চামড়া কম কেনার কথা বলছেন। তারা চামড়া না নিলে আড়তদাররা তখন কী করবেন?

দেলোয়ার হোসেন :ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দরের সঙ্গে সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার বাড়তি ব্যয় যোগ করে চামড়া না কিনলে তা ওয়েট ব্লু (প্রক্রিয়াজাত) করা হবে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ট্যানারিগুলো চামড়া না নিলে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা কাঁচা চামড়া কিংবা ওয়েট ব্লু রফতানির সুযোগ চাওয়া হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে রফতানির ব্যবস্থা করা হবে। আড়তদাররাও একমত হয়েছেন সংগৃহীত চামড়া বিক্রি না হলে রফতানির জোরালো দাবি জানাবেন।

সমকাল :দাম কম ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চামড়া পাচার বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কেমন?

দেলোয়ার হোসেন :স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন গত বছর চামড়া পাচার হয়নি, এবারও হবে না। সীমান্তে রেড অ্যালার্ট দেওয়া হবে। সব চামড়া ঢাকামুখী করার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এবার চামড়া কেনার লক্ষণ খুব একটা সুবিধার নয়। ট্যানারিগুলো চামড়া কেনায় জোর না দিলে পাচারের শঙ্কা বাড়বে। তাছাড়া এবারের আবহাওয়া চামড়া কেনাবেচার জন্য ঠিক উপযোগী নয়। বৃষ্টিতে চামড়া নষ্ট হতে পারে। আবার অতি গরমেও চামড়ার ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। গত বছর ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। এবার সঠিক সময়ে লবণ না দিলে আরও বেশি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সমকাল :চামড়ায় কখন এবং কী পরিমাণ লবণ ব্যবহার করতে হয়? এবার লবণের দর কেমন ছিল।

দেলোয়ার হোসেন :বর্তমান আবহাওয়ায় জবাই হওয়ার ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিতে হবে। একটি বড় গরুর চামড়ায় ১০ থেকে ১২ কেজি লবণ লাগে। মাঝারি গরুর চামড়ায় ৭ থেকে ৮ কেজি এবং ছোট গরুর চামড়ায় ৪ থেকে ৫ কেজি লবণ লাগাতে হবে। ছাগলের চামড়ায় গড়ে এক কেজি লবণ ব্যবহার করতে হবে। এরই মধ্যে বেশির ভাগ আড়তদার লবণ কিনে প্রস্তুতি নিয়েছেন। যারা বাকি আছেন তারাও ঈদের আগেই সংগ্রহ করবেন। এবার লবণের দাম অন্য বছরের চেয়ে কম থাকায় কিছুটা সুবিধা হবে। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় কিনছেন আড়তদাররা।

সমকাল :কাঁচা চামড়ার দূষণ রোধে আপনাদের পরিকল্পনা কি?

দেলোয়ার হোসেন :চামড়া শিল্পনগরী সাভারে এবং আড়তগুলো ঢাকায় থাকায় দূষণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে যোগসূত্রও বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। লালবাগের পোস্তায় অবস্থিত কাঁচা চামড়ার আড়াতগুলো সাভারে স্থানান্তরের প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে স্থানান্তরের আশ্বাসও মিলেছে। সাভার শিল্পনগরীতে ৩০ একর জায়গা পাওয়া গেলে একই স্থানে থেকে পরিকল্পিতভাবে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প খাত গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ঢাকায় এখন তিন শতাধিক আড়ত রয়েছে। সারাদেশে এ সংখ্যা চার থেকে পাঁচ হাজার।