ঋণের বেড়াজালে বন্দি গ্রাহক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯      

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)

নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে কমলগঞ্জের নিম্ন আয়ের মানুষের এমনিতেই চুলা জ্বলছে না। এর ওপর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সমিতি থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি শোধের চাপে দিশেহারা তারা। ইতিমধ্যে এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধে অনেকে শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছেন। এনজিও কর্মী অথবা সমিতির লোকজন বাড়িতে গিয়ে কিস্তি শোধের চাপ দিয়ে টাকা আদায় করতে না পেরে পুলিশি হয়রানিও করছেন। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা সময় মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় এনজিওর পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তাই এখন পুলিশের ভয়ে গ্রাহকদের কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের সতিঝির গ্রামের রাবিয়া বেগম বলেন, 'অভাবে পড়ে ব্র্যাকের সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা দিতে না পারায় পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে আমার স্বামীকে আটকে রাখে। পরে কিস্তির টাকা দিয়ে স্বামীকে ছাড়িয়ে আনি। ব্র্যাকের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে স্বামীরে একটি রিকশা কিনে দিলেও অভাব আর দুর্যোগের কারণে কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে। পরে ম্যানেজার থানায় অভিযোগ দেন।'

সরেজমিনে ঘুরে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল হলেই ঋণের টাকার কিস্তির জন্য হাজির হন এনজিও কর্মীরা। অনেক পরিবার একাধিক এনজিওর ঋণে জর্জরিত। একটির কিস্তি পরিশোধ করতে না করতেই অন্যটির টাকা জোগাড় করতে হয়। ফলে ঋণগ্রহীতাদের দাদন ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হতে হয়। মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চহারে সুদ বা কমমূল্যে আগাম ফসল বিক্রি করে টাকা নিয়ে এনজিওর কিস্তি দিতে হয়। এমনিভাবে তাদের ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়ে চলছে। এক ঋণ থেকে বাঁচতে অন্য ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন তারা। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গৃহবধূর স্বর্ণালঙ্কার, হালের পশু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করেও পার পাচ্ছে না অনেক পরিবার। শেষ সম্বল বাপ-দাদার বসতভিটাও বিক্রি করেছেন অনেকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়- ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, টিএমএস, ব্যুরো বাংলাদেশ, পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন, আরডিআরএস বাংলাদেশ, মুসলিম এইডসহ প্রায় ২২টি এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে বিভিন্ন নামে ১৫টি সংস্থা ঋণদান করছে। গ্রাম পর্যায়ে সমিতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করার কথা। তবে অভাব, অনটন, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেউ কেউ কিছুদিন সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। ফলে দুই কিস্তি, তিন কিস্তি, চার কিস্তি হারে টাকা বকেয়া হয়ে পড়ে। এনজিও কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তির টাকা আদায়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। ফলে ঋণের চাপ, পুলিশের হয়রানি, আটক করে নেওয়ার ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন গ্রাহকরা। কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সম্প্রতি ব্র্যাকের শমশেরনগর শাখা ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে ১০ গ্রাহকের বিরুদ্ধে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

রুনু বেগম (সদস্য নম্বর-১৬৮) বলেন, ব্র্যাকের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছিলাম। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় ব্যবস্থাপক থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। এখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে আছি। অভিযোগ বিষয়ে ব্র্যাক শমশেরনগর শাখা ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান বলেন, কিস্তি আদায় করতে না পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ ইউএনও আশেকুল হক বলেন, 'ক্ষুদ্রঋণের জন্য কারও পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে থানার ওসির সঙ্গে কথা বলব।'