সর্বশেষ চার আসরের তিনবার চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। শেষ তিন আসরের দু'বার রানার্সআপ জুভেন্তাস। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে রিয়াল মাদ্রিদ-জুভেন্তাস ম্যাচ মানেই রোমাঞ্চকর কিছুরই প্রতিশ্রুতি। গত বছরের জুনে কার্ডিফে অনুষ্ঠিত ফাইনালটি হয়েছিল একপেশে। লস ব্লাঙ্কোসরা জিতেছিল ৪-১ গোলে। ২০১৫ সালের সেমিফাইনালে হয়েছে এর উল্টো চিত্র। দুই লেগ মিলিয়ে জুভেন্তাস জিতেছিল ৩-২ গোলে। ইউরোপিয়ান ক্লাব প্রতিযোগিতায় ১৮০ মিনিটের গল্পটা জুভদের। আবার ৯০ মিনিটে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরা। গল্পের পরের অংশটা কেমন হবে, সেটা জানা যাবে আজ। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে তুরিনে রিয়ালকে আতিথ্য দেবে জুভেন্তাস। নক আউট পর্বের ইতিহাস বলছে, আজকের ম্যাচে ফেভারিট ইতালিয়ান জায়ান্টরা। আবার এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফর্ম বলছে জিনেদিন জিদানের দল এগিয়ে। ঘরের মাঠ বলেই নয়, ইতালিয়ান ঐতিহ্যে জুভেন্তাসের রক্ষণভাগ খুবই শক্তিশালী। আবার রিয়ালের আছে বিশ্বসেরা আক্রমণভাগ। এক অর্থে ম্যাচটিকে রিয়ালের আক্রমণ বনাম জুভেন্তাসের রক্ষণও বলা যায়। বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১টায় রোমাঞ্চকর লড়াইটি শুরু হবে। দু'দলের মধ্যকার ফিরতি লেগ অনুষ্ঠিত হবে ১১ এপ্রিল সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে।

দশ মাস আগে এই জুভেন্তাসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ১২তম শিরোপা জিতেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তুরিনে আজকের ম্যাচটি জুভেন্তাসের কাছে প্রতিশোধেরও। শেষ ষোলোতেই বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল ম্যাসিমিলিয়ানো আলেগ্রির দল। টটেনহাম হটস্পারের বিপক্ষে প্রথম লেগে ঘরের মাঠে ২-২ গোলে ড্র করেছিল জুভরা। ফিরতি লেগে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে টটেনহামকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল জিয়াইনলুইজি বুফনের দল। শেষ আটে ওঠার পথে রিয়াল অতিক্রম করেছিল প্যারিস সেইন্ট জার্মেই বাধা। ফরাসি জায়ান্টদের অনেকটা হেসেখেলেই দুই লেগে মিলিয়ে ৫-২-এ হারিয়েছিল লস ব্লাঙ্কোসরা। বিশতম বারের মতো জুভেন্তাস-রিয়াল লড়াই। আগের ১৯ লড়াইয়ে রিয়াল ৯টিতে ও জুভেন্তাস জিতেছিল ৮ ম্যাচে। বাকি দুই ম্যাচ হয়েছিল অমীমাংসিত। কিন্তু আজ জয়ের স্বপ্ন তুরিনের ওল্ড লেডিদের হৃদয়ে। সেই স্বপ্নের পেছনে বড় প্রেরণা ২০১৫ সালে সেমিফাইনাল ম্যাচ। প্রথম লেগে তুরিনে ২-১ গোলে জিতেছিল জুভেন্তাস। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরতি লেগে ১-১ গোলে ড্র করে রিয়ালকে বিদায় করেছিল তারা। এবারও সেই আশায় ইতালিয়ান জায়ান্টরা।

কোপা দেল রে থেকে আগেই ছিটকে গেছে। স্প্যানিশ লা লীগায় বার্সেলোনার চেয়ে পিছিয়ে ১৩ পয়েন্টে। শিরোপা জয়ের আশা প্রায় শেষ লস ব্লাঙ্কোসদের। সব আশা চ্যাম্পিয়ন্স লীগকে ঘিরেই। এই ট্রফি জিততে না পারলে চাকরিটা হারাতে হতে পারে জিদানকে। এমনও হতে পারে, সাবেক ক্লাবের কাছেই বিদায়ের রাস্তা খুলে যেতে পারে। জুভেন্তাসের হয়ে ফুটবল মাঠ মাতিয়েছেন। এবার সেই দলের বিপক্ষেই ডাগ আউটে দাঁড়াবেন জিদান। কার্ডিফে জয়ের গল্প লিখেছিলেন। তুরিনে নিজের প্রিয় গ্রাউন্ডে কি জিদানের পরাজয়ের গল্প লিখবেন বুফনরা? তুরিনে ফিরলেও আবেগ কাজ করছে না ফরাসি কিংবদন্তির মাঝে, 'আমি তুরিনেরই একজন। আমি সর্বদা জুভেন্তাসের সমর্থক। কিন্তু এখন আমার হৃদয়ে রিয়াল মাদ্রিদ। অনেক কারণেই আমি জুভেন্তাসকে এড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু লটারিতে তো উঠে গেছে, এখন করার কিছু নেই।'

গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে বুফনকে দু'বার পরাস্ত করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আক্রমণ বনাম রক্ষণের লড়াই হলেও আজ সবার দৃষ্টি থাকবে রোনালদো ও বুফনের দিকে। জুভেন্তাস গোলরক্ষক তো বলেই দিয়েছেন, রোনালদোর কারণে কয়েকটা রাত তার নিদ্রাহীন কেটেছে। সেই রাতটি হয়তো গতকালও ছিল বুফনের, 'যখন আপনি রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বসেরা ক্লাবের বিপক্ষে খেলবেন, আর একজন খেলোয়াড় আছেন যিনি কি-না পার্থক্য গড়ে দেবেন। তাকে নিয়ে আপনাকে তো ভাবতেই হবে। যখনই জেনেছি, রোনালদোর মুখোমুখি হতে হবে, আমার যেন কয়েকটি রাত নিদ্রাহীন কেটেছে।' এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সব ম্যাচেই গোল করেছেন সিআর সেভেন।

রিয়ালের যেমন আছেন রোনালদো, তেমনি জুভেন্তাসেরও আছেন পাওলো দিবালা। টটেনহামের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে জয়সূচক গোলটি ছিল এ আর্জেন্টাইনের। একসঙ্গে এসি মিলানের বিপক্ষে সিরি-এ লীগের ম্যাচেও নায়ক ছিলেন দিবালা। আজ রোনালদো না দিবালা? কে হাসবেন শেষ হাসি। রোনালদো ছাড়াও রিয়ালের আক্রমণভাগে আছেন করিম বেনজেমার মতো তারকা। লা পালমাসের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেও শুরুর একাদশে গ্যারেথ বেলকে নামানোর সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে বেলের জায়গায় শুরুতে দেখা যেতে পারে মার্কো অ্যাসেনসিও ও ইসকোকে। দু'জন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ছাড়া আজ নামতে হবে জুভেন্তাসকে। নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রথম লেগে নেই মিরালেম পিজানিক ও মেহেদি বেনাত্তিয়া।

সংখ্যাতথ্য
৯ :চ্যাম্পিয়ন্স লীগের নকআউট পর্বে স্প্যানিশ দলগুলোর বিপক্ষে নয়টি ম্যাচ জিতেছে জুভেন্তাস, হেরেছে ছয়টিতে। গত মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনালে দুই লেগ মিলিয়ে বার্সেলোনাকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল জুভরা।

৩-০ :চ্যাম্পিয়ন্স লীগে স্প্যানিশ ক্লাবের বিপক্ষে সর্বশেষ লড়াইয়ে হেরেছে জুভেন্তাস। গ্রুপ পর্বে প্রথম লেগে বার্সেলোনার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল জিয়ানলুইজি বুফনের দল। ফিরতি লেগটি গোলশূন্য ড্র হয়েছিল।

৫৬ :উয়েফা প্রতিযোগিতায় স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে মোট ৫৬ বার মুখোমুখি হয়েছিল জুভেন্তাস। ১৯টিতে জয়, ২২টিতে হার ও ১৫ ম্যাচে ড্র করেছিল জুভরা।

৭ :বার্সেলোনার কাছে হারের পর চ্যাম্পিয়ন্স লীগে টানা সাত ম্যাচ অপ্রতিরোধ্য জুভেন্তাস। শেষ ষোলোতে ঘরের মাঠে টটেনহাম হটস্পারের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছিল। তবে ফিরতি লেগে টটেনহামকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল জুভরা।

৩৫ :এ নিয়ে ৩৫তম বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলছে রিয়াল মাদ্রিদ।

৮ :চ্যাম্পিয়ন্স লীগে টানা আটবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে রিয়াল, যা ক্লাব রেকর্ড। এর মধ্যে সাতটি কোয়ার্টার ফাইনালে জিতেছে লস ব্লাঙ্কোসরা।

৫ :ইতালিয়ান ক্লাবটির বিপক্ষে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচেই জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ২০১৫ সালে সেমিফাইনালে জুভেন্তাসকে হারানোর পর ২০১৬ সালে শেষ ষোলোতে ন্যাপোলির বিপক্ষে জিতেছিল লস ব্লাঙ্কোসরা।

১ :ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রথম ফুটবলার, যিনি কি-না গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন। শেষ ষোলোর দুই লেগেও গোল করেন পাঁচবারের বর্ষসেরা এ ফুটবলার। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের এবারের মৌসুমে তার মোট গোল ১২টি।

মন্তব্য করুন