যখন দু'পা ছিল সম্বল

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০

কাজী মোজাম্মেল হক

১৯৭১ সাল। আমার বয়স তখন ঊনত্রিশের কোঠায়। শ্রমিক নেতৃত্ব দিই গাজীপুরে। শত শত নেতাকর্মীর ভিড়েই দিনের বেশিরভাগ সময় চলে যায়। '৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের আন্দোলন, '৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন ও '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি অংশগ্রহণ করি।

মার্চ মাস। দেশের অবস্থা ক্রমশ ভয়ংকর হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকা শহর ও ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালন এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজামায়েতের তারিখ ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে সমগ্র দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই ঢেউ এসে লাগে গাজীপুরেও। 'জয় বাংলা', 'পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা' 'জনগণের এক দফা, বাংলার স্বাধীনতা' স্লোগানে মুখর পুরো শহর। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী ৭ মার্চের গণজামায়েতের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সেদিন সকালে টঙ্গী ও গাজীপুর থেকে শ'খানেক বাস ও ট্রাক জোগাড় করে হাজারো মানুষ প্রস্তুত করলাম। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার এসব মানুষকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য যাব রেসকোর্স ময়দানে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার আগেই দলবল নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে হাজির হলাম।

এরই মধ্যে পুরো ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ।

ভাষণ শেষে হেঁটে রাতেই টঙ্গীর বাড়ি ফিরে আসি। ১৯ মার্চ। গাজীপুরে সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম অগ্নিস্টম্ফুলিঙ্গের জন্ম। 'জয়দেবপুরের পথ ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানে পুরো গাজীপুর শহর মুখরিত। ২৬ মার্চের স্বাধীনতা লাভের নেপথ্যে গাজীপুরবাসীর রক্তঝরা প্রতিবাদের বলেই বীর বাঙালি যুদ্ধ করার প্রবল শক্তি পেয়েছিল।দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ় সংকল্প হৃদয়ে ধারণ করে বাড়ি থেকে হেঁটে প্রশিক্ষণ নিতে ভারত চলে যাই। হাঁটতে হাঁটতে পা দুটি ফুলে পুরো শরীর অবশ হয়ে পড়েছিল। সহযাত্রীদের কেউ কেউ মাঝপথ থেকে ফিরে এলেও আমি দমে যাইনি, শেষ দিন পর্যন্ত যুদ্ধ করেছি রণাঙ্গনে।

আগরতলা গোকুলনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়ে উঠি। সেখানে পেয়ে যাই আগরতলা মুজিব বাহিনীর অন্যতম রূপকার অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনিকে। একপর্যায়ে আমাকে আগরতলা বাধারঘাটে স্থাপিত ক্যাম্পের ইনচার্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দেরাদুনে বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি যুদ্ধের ময়দানে। নভেম্বরের প্রথম দিকের কথা। অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিয়ে হেঁটে আবার চলে আসি দেশে। নরসিংদী হয়ে পুবাইলের উলুখলা ওডাঙ্গী এলাকায় প্রথম পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি গুলিবিনিময় হয়। একপর্যায়ে পাকিস্তানিরা পরাস্ত হয়ে চলে যায়। আমি ফিরে আসি টঙ্গী এলাকায়।

ঢাকার উত্তরে আটটি উপজেলার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পাই। যুদ্ধ চলছে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের ঠিক আগের দিন গাজীপুরের ছয়দানা মালেকের বাড়িতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের ভয়াবহ এক সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিই। আমাদের বীর যোদ্ধারা অসীম সাহসের সঙ্গে লড়ে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে।

১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এ এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। মাত্র ৭৯ দিনের ব্যবধানে ৩ নভেম্বর কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সহকর্মী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে ঘাতক চক্র হত্যা করে। এ সময় আমিও রাজনৈতিক মামলায় বন্দি হয়ে প্রায় তিন বছর কারাভোগ করি। এ সময়ের একটি স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারি না। আমি তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আর আমি একই রুমে বন্দি ছিলাম। আমার সামনে থেকে মনসুর আলীকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। আমাদের পাশের রুমেই ছিলেন অন্য তিন জাতীয় নেতা। এ দিন তাদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

লেখক, মুক্তিযোদ্ধা

অনুলিখন :: ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর