ভাবনা ছিল একটাই

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০

মনিরুজ্জামান মনোজ

১৯৭১ সালে আমি রাজশাহী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে আমরা মোটামুটি বুঝলাম, দেশে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। ২৫ মার্চ ঢাকায় আক্রমণের কথা আমরা রেডিওতে শুনতে পাই।

আমি তখন রাজশাহী কলেজের পাকিস্তান ক্যাডেট কোরের (পিসিসি) কমান্ডার ছিলাম। আমাদের কলেজের ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের জন্য ১১০টা রাইফেল ছিল। থ্রি নট থ্রি অরিজিনাল রাইফেল দিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

খবর পেলাম ঢাকা, যশোর, বগুড়া থেকে সেনাবাহিনী রাজশাহীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল আমাদের ইপিআর। কিন্তু তাদের কাছে ভারী তেমন অস্ত্র ছিল না। আমরা শুনলাম, পাকিস্তানি বাহিনী তরুণ ছেলেদের হত্যা করছে। বাঁচার জন্য তখন ইন্ডিয়ার বর্ডারে যাই। ইন্ডিয়ার কোথায় যাব, কিছু চিনি না। আমরা চার বন্ধু মিলে রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপালের বাড়ির পেছন দিয়ে পদ্মার পাড় দিয়ে হেঁটে কাতলামারী (বর্তমান শেখপাড়া) বর্ডার দিয়ে ওপারে চলে যাই। বর্ডারে বিএসএফ ধরল, কোথায় যাবে? আমরা বললাম- আমাদের দেশে যুদ্ধ চলছে, তারা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, পেলে হত্যা করছে।

তখন বিএসএফের সদস্যরা বর্ডার খুলে বলল- যাও। সেখানে শেখপাড়া নামে একটি ক্যাম্প ছিল, সদস্য রিক্রুটমেন্ট তখনও হয়নি। রতন নামের এক বড় ভাই, বন্ধু বাদল ও আমি চলে গেলাম বহরমপুরে। সেখান থেকে ট্রেন ধরে চলে যাই কলকাতায়। রতন ভাইয়ের পরিচিত লোক ছিল কলকাতায়। সেখানে গিয়ে জানলাম, কলকাতার বিধানসভা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন কে.ডি স্ট্রিটে জাতীয় চার নেতা থাকেন। কলকাতায় ছাত্রলীগ নেতা মুস্তফা মহিউদ্দিন মন্টুর সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে আবু ওসমান নামে এক মেজর ছিলেন। তিনি বললেন, আমাদের এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা বলি- যুদ্ধ কীভাবে করব, কী দিয়ে করব? আমাদের তো কোনো কিছু নেই। তিনি তখন বলেন, আপনারা আমার সঙ্গে কৃষ্ণনগর চলেন। কৃষ্ণনগর থেকে আমরা বৈদ্যনাথতলা (বর্তমান মুজিবনগর) আম্রকাননে ইপিআরের একটি ক্যাম্পে এলাম। ১৭ এপ্রিল সেখানে প্রথম বাংলাদেশ সরকার শপথ নেয়। সে অনুষ্ঠান আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি। এরপর সেখান থেকে কিছুটা দূরে ভারত সীমান্তে হৃদয়পুর নামে একটি এলাকায় ক্যাম্প ছিল, সেখানে যাই।

কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, গাংনী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এই ক্যাম্পে তরুণ ছেলেরা চলে আসে। সেখান থেকে বনগাঁ নামে এক গ্রামের স্কুলে সবাইকে জড়ো করা হয় প্রশিক্ষণের জন্য। কিন্তু কোথায় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে সেটি আমাদের জানা নেই। সেখান থেকে ১১৫টি ট্রাকে ১৫ জন করে মুক্তিযোদ্ধাকে তোলা হলো। সারারাত ট্রাকে ছিলাম, সকালে দেখি পাহাড়ি এলাকা- লাল লাল পাহাড়, কোথায় যাচ্ছি কিছু জানি না, ট্রাক আমাদের নিয়ে চলছেই। বিকেলে যখন পৌঁছলাম তখন জানলাম আমরা বিহারের সিঙ্গুম জেলার চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টে এসেছি। এটি একটি বিধ্বস্ত ক্যান্টনমেন্ট, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটিকে আক্রমণ করা হয়। তেমন বিধ্বস্তই ছিল। আমরা সেখানে প্রায় ১ মাস ১০দিন প্রশিক্ষণ নিই। তারপর যার যার ক্যাম্পে আবার ফেরত পাঠানো হয়। আমার রিক্রুটমেন্ট যেহেতু কৃষ্ণনগর ক্যাম্পে সেজন্য আমাকে কৃষ্ণনগরেই রেখে দিল।

ওই ক্যাম্পের অফিসারকে বললাম, আমার বাড়ি রাজশাহী, আমাকে রাজশাহী এলাকার সেক্টরে পাঠিয়ে দিন। তিনি তখন আমাকে ধুলাউড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে দুটি ক্যাম্প ছিল। একটি বাংলাদেশের আরেকটি ছিল ইন্ডিয়ার ভেতরে। বাংলাদেশের ভেতরের ক্যাম্পে তিন দিন ছিলাম। একদিন রশিদ সাহেব ও গিয়াস সাহেব জিপ নিয়ে ক্যাম্পে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- এখানে নতুন কে কে আছো, তোমরা জিপে ওঠো। জিপে করে কাজীপাড়া ক্যাম্প তিন দিন রাখে। সেখান থেকে আমাদের রাজশাহীর কাটাখালী ব্রিজ উড়িয়ে দিতে পাঠানো হয়। চারজন ইপিআর আর সাধারণ আটজনকে নিয়ে একটি টিম তৈরি করা হয়। আমাদেরকে গ্রেনেড, রাইফেল সব দেওয়া হয়। জুনের মাঝামাঝি সময়। তখন পদ্মা ছিল প্রমত্তা, ভরা বর্ষাকাল। সন্ধ্যায় নৌকায় করে রওনা দিয়ে ৬ ঘণ্টা পর এপারে পৌঁছলাম। নৌকায় ওঠার আগে রশিদ আর গিয়াস সাহেব আমাদের বলেছিলেন, রাতে রাজশাহীতে আমরা মর্টার ছুড়ব, যাতে পাকিস্তানিদের নজর মর্টারের দিকে থাকে।

আমরা কিছু সময় অপেক্ষা করে ব্রিজের ওপর একটা গ্রেনেড ছুড়ি, গ্রেনেড ছোড়ার পর যারা ব্রিজের পাহারায় ছিল সবাই ব্রিজ থেকে দৌড়ে পালাল। আমরা ব্রিজের ওপর উঠে গেলাম। এক্সপ্রুয়েলের সঙ্গে সেফটি ফিউজে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সরে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে ব্রিজটি উড়ে গেল। সফল অপারেশনের পর ক্যাম্পে ফিরে আসি।

যুদ্ধে আমার কোনো সহযোদ্ধা শহীদ হয়নি। যশোরের একটা সম্মুখযুদ্ধের কথা মনে পড়ে। সেখানে একটা গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেখানে আমাদের একজন শহীদ হন। সেখানে রাজশাহীর আমি একা ছিলাম। ফরিদপুর, কুষ্টিয়াসহ সব জায়গার লোক ছিল। তবে আমাদের একটা পরিচয় ছিল, আমরা সবাই বাঙালি, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা, দেশ স্বাধীন করতে হবে- এটাই ছিল ভাবনা।

লেখক, মুক্তিযোদ্ধা

অনুলিখন :: সৌরভ হাবিব, ব্যুরোপ্রধান, রাজশাহী