নীরবে সয়ে যাওয়া

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০১৯      

জোবায়দা আক্তার জবা

ট্রেনিং শেষ করে অফিস থেকে বের হলো অয়ন। বেশ কিছু কাজ আছে, বাইকের কাগজ করাতে হবে। ডিসি কোর্ট বিআরটিএ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে। খাবারের বিরতি চলছে। অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই।

বিরক্তি লাগছে! একা, কেউ সঙ্গে আসেনি যে গল্প করে কাটিয়ে দেবে। টিপটিপ বৃষ্টি হয়ে এখন আবার রোদের ছাঁট। গরমটা তীব্র। কেমন গুমোট অবস্থা! মোটামুটি ভিড়ের মাঝে একপাশে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে নিউজফিড দেখছিল। আনমনে টিপে যাচ্ছে ফোন, খুব একটা মনোযোগ নেই। হঠাৎ কেমন একটা অবয়ব ওকে কিছুটা সচেতন করল। ফোন রেখে সেদিকে তাকানোর লোভ হলো, হয়তো কৌতূহল অথবা আদিম সেই কারণ। যে কারণে পৃথিবীর সব পুরুষ নারীমূর্তির দিকে একবার হলেও তাকায়। একপাশ থেকে দেখে চেনা মনে হচ্ছে নারীমূর্তিকে। আবার চিনতেও কষ্ট হচ্ছে। হয়তো অয়নের ভুল হচ্ছে কোথাও। এ রকম পরিচিত মুখ মনে নেই একেবারে। তবুও বারবার তাকাতে মন সায় দিল। এক সময় ঘুরে এসে মুখটা ভালো করে দেখল। হুম, এ তো রুমার মতো, না তো রুমাই। বেশ একটু পরিবর্তন হয়েছে। হতেই পারে, পাঁচ বছর তো কম সময় নয়। বেশ সুন্দরী হয়েছে, মুখটা আগের চেয়ে উজ্জ্বল হয়েছে। যে কোনো পুরুষ আকৃষ্ট হবে। এ রকম হরেক ভাবনায় ডুবে থাকল অয়ন। অবচেতন মনে অয়নের খেয়াল হচ্ছে- রুমাও ওকে দেখেছে এবং তাকিয়ে থেকেছে। সেদিনের সব কথা চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসছে। রুমা অয়নের প্রাক্তন স্ত্রী। পারিবারিক পছন্দে বিয়ে হয়েছিল ওদের। কিন্তু সেই পরিবারকে মানিয়ে নিতে রুমা অপারগতা স্বীকার করেছিল। অয়নের পক্ষেও ওই সময় পরিবার ফেলে আসা সম্ভব নয়। ওই সময় কেন, আজও পারেনি অয়ন পরিবারকে ছুড়ে ফেলতে। মা-বাবাকে ফেলে সুখের পৃথিবী অয়নের কাছে নরকের সমান।

অনেক বুঝিয়েছিল রুমাকে, কিন্তু রুমার একরোখা জেদ। সে বিলাসী জীবনযাপন করবে। এসব সেকেলে পরিবার। সেবা তার দ্বারা সম্ভব নয়। এক রকম জোর করে ডিভোর্স চাইছিল রুমা। ওর কয়েকজন বন্ধু রুমার পাশে দাঁড়িয়ে অয়নকে অপমান-অপদস্থ করেছে, রুমা মুখ বুজে উপভোগ করছিল। তারপর ডিভোর্স নামক নিয়মের কাগজে সই করে দিল অয়ন। ভালো বেসেছিল রুমাকে তাই বুকের পাঁজর ভেঙেছিল সেদিন। আজ রুমা সুখী হয়েছে তো?

পছন্দের পরিবার পেয়েছে?

ওর কাঁধের ঝোলানো ব্যাগটা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো এনজিওতে জব করে। এত এত প্রশ্ন অয়নের মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সব উত্তর নিতে হবে। উত্তেজিত অয়ন সামনে তাকাতেই দেখল রুমা নেই ওখানে দাঁড়িয়ে। চলে গেছে? না যেতে পারে না, সেও অয়নকে দেখেছে।

অয়নের বিশ্বাস, রুমা আবার আসবে। অন্তত জানতে চাইবে, কেমন আছ?

দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে অয়ন দু'ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সন্ধ্যা নেমে আসছে, সবকিছু কেমন ব্যস্ত আধো আঁধারকে বরণ করতে। অয়নের বিশ্বাস আর টিকে থাকেনি।

সে হেরে গেছে। বরাবর অয়নের পরাজয়। ভালোবাসা অয়নকে প্রতিনিয়ত পরাজিত করে। রুমারা ভালোবাসতে জানে না, ফিরে আসা অথবা সন্ধি- এসব রুমা চরিত্রের বিরোধী। অয়ন এটা বুঝেছে কিন্তু মানতে কষ্ট হয়। কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা নিয়ে অয়ন নীরবে

বাড়ি ফিরল।