৫০ টাকা খরচ করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখেয়েছেন নোয়াখালীর কনক কর্মকার। পাঁচটি রেকর্ড গড়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া এই তরুণ এখনও আছেন পড়াশোনায়। ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পাওয়ার টেকনোলজি বিষয়ে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন কনক। ১৭ বছর বয়সে মাগুরার মাহমুদুল হাসান ফয়সাল দু'বার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়ে সাড়া ফেলে দেন। গত বছর ফ্রি স্টাইল আর্মরোলিংয়ের পর এ বছর বাস্কেট বল ফ্রি স্টাইল আর্মরোলিংয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছেন ফয়সাল। বগুড়ার আব্দুল হালিম পরপর তিনটি রেকর্ড নিজের ঝুলিতে পুরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে গড়েন হ্যাটট্রিক। এই তিন স্বপ্নছোঁয়া তরুণকে নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ রচনা লিখেছেন শাহনেওয়াজ টিটু

৫০ টাকায় কনকের রেকর্ড

কনক সেই এইটুকুন বয়স থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে সেই স্বপ্নকে উস্কে দেয় ইউটিউব। ইউটিউবে দেখেন ফুটবল নিয়ে কসরতের ভিডিও। জানেন, এর নাম ফুটবল ফ্রি স্টাইল। তারপর প্র্যাকটিস শুরু করেন কনক। ফুটবল হয়ে ওঠে তার একমাত্র সঙ্গী। এই ফুটবল সঙ্গে নিয়েই নাওয়া-খাওয়া। কিছুদিনের মধ্যে আয়ত্ত করে ফেলেন ব্যালান্সিং। এই ব্যালান্সিংকে পুঁজি করেই এগোতে থাকেন। কপালে ১১৫০টি কাপ ব্যালেন্স করে সাড়া ফেলে দেন। হয়ে যায় রেকর্ড। ওমা, কয়েকদিন পর সেটিই উঠে আসে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। এরপর একে একে আরও পাঁচটি রেকর্ড গড়েন কনক। মাত্র আট মাসে এমন রেকর্ড এর আগে করতে পারেনি দেশের কেউই। পাঁচটি রেকর্ড গড়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী বনে যান তিনি। কনক দ্বিতীয় রেকর্ড গড়েন গিটার দিয়ে। লংগেস্ট টাইম ব্যালেন্সিং আ গিটার অন ফরহেড শিরোনামের এই রেকর্ডে ২৫ মিনিট কপালে গিটার ব্যালেন্স করে গড়েন। তৃতীয় রেকর্ড সঙ্গী বাস্কেটবল। চতুর্থ রেকর্ডে ফের সঙ্গী গিটার। ডিম দিয়ে পঞ্চম রেকর্ড গড়তে মাত্র পঞ্চাশ টাকা খরচ হয় কনকের। তবে এই রেকর্ডের সঙ্গী বন্ধু ফখরুল ইসলাম। ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পাওয়ার টেকনোলজি বিষয়ে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন নোয়াখালীর এই মেধাবী কনক কর্মকার।

আব্দুল হালিমের হ্যাটট্রিক রেকর্ড

বগুড়ার সন্তান আব্দুল হালিম শুধু একবার নয়, পরপর তিনটি রেকর্ড নিজের ঝুলিতে পুরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে গড়েন হ্যাটট্রিক। ২০১১ সালের ২২ অক্টোবর ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ট্র্যাকে মাথায় বল নিয়ে টানা ১৫.২ কিলোমিটার হাঁটার ভিডিও দৃশ্য ধারণ করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েন হালিম। হারিয়ে দেন ১১.১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে বিশ্ব রেকর্ড গড়া মালয়েশিয়ার ই মিং লুকে। এরপর ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকায় মাথায় বল নিয়ে দ্রুততম সময়ে স্কেটিং জুতা পরে ১০০ মিটার অতিক্রম করেন হালিম। কমলাপুর রেলস্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে তিনি এই খেলা প্রদর্শন করেন ২৭.৬৬ সেকেন্ডে। এর ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ তাকে দ্বিতীয়বারের মতো স্বীকৃতি দেয়। ২০১৭ সালের ৮ জুন শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে বল মাথায় নিয়ে সাইকেল চালিয়ে ১৩.৭৪ কি.মি. পথ অতিক্রম করে 'গ্রেটেস্ট ডিসট্যান্স ট্রাভেলড অন এ বাইসাইকেল ব্যালেন্সিং :এ ফুটবল অন হেড' ক্যাটাগরিতে রেকর্ড গড়ে হ্যাটট্রিক করেন হামিদ। এতে তার সময় লাগে ১ ঘণ্টা ১৯ মিনিট। আব্দুল হালিম ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চ মাগুরার শালিখা উপজেলাধীন শতখালী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামে জন্ম নেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ফুটবলের মায়ায় পড়েন। একসময় স্থানীয় ফুটবল দলের হয়েও খেলেছেন। গোল বলেই তার দুনিয়া জয়ের স্বপ্ন। শুরু করেন কসরত। একসময় নিজেই অবাক হয়ে দেখেন, ফুটবল নিয়ে হালিম অর্ধশতাধিক আকর্ষণীয় খেলা শিখে গেছেন। স্থানীয়রা তাকে ডাকতেন ফুটবলের 'জাদুকর' বলে। গ্রামের মেলায় বা ফুটবল-ক্রিকেট খেলায় বেশ কয়েকটি বল নিয়ে হাজির হয়ে দেখাতেন ফুটবলের কসরত। মুগ্ধ হয়ে সবাই দেখেন তার ফুটবল কসরত। ফুটবল মাথায় নিয়ে গাছে ওঠা, নদী বা পুকুরে গোসল করা, বাইসাইকেলে চড়ে বেড়ানো তার জন্য কোনো ব্যাপারই না! এমন লোকের জন্যই তো এই সম্মান।

মিনিটে ১৪৪ বার বল ঘোরানো ফয়সাল

৬০ সেকেন্ডে দুই হাতে ১৪৪ বার বাস্কেট বল ঘুরিয়ে এবার রেকর্ড গড়েন ফয়সাল। এর আগে একই সময়ে ১৩৪ বার দুই হাতের মধ্যে ফুটবল ঘুরিয়ে প্রথমবারের মতো গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন। মাগুরা সদর উপজেলার হাজিপুর গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সোহেল রানার সন্তান ফয়সাল। পড়াশোনায়ও খুব মনোযোগী ফয়সাল। পড়ছেন মাগুরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ম্যাকাটনিক্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষে। ফয়সাল স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হওয়ার। এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিনমান পরিশ্রম করতেন। প্র্যাকটিস করতেন বন্ধুদের সঙ্গে। কখনও আবার একা। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তেমন ভালো করতে পারেননি। নিজেকে গড়ে তুলতে পারেননি মনমতো। তাই অন্য কিছু করার কথা ভাবলেন। সেই সঙ্গে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হয়ে পড়লেন। এর মধ্যেই মাথায় আসে ফ্রি স্টাইলার ফুটবলার হওয়ার ভাবনা। ভেবেচিন্তে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি বাড়ির আঙিনা ও স্থানীয় মাঠে ফুটবল নিয়ে নানা কলাকৌশল আয়ত্তে আনার জন্য অনুশীলন শুরু করেন। শুরুর দিকে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কঠোর অনুশীলন ও মনোবলকে কাজে লাগিয়ে মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে এসে তিনি প্রথম সাফল্য পেয়ে যান। ফয়সাল যাদের রেকর্ড ভেঙে নিজে রেকর্ড গড়েন তারা দু'জনই বিদেশি। মাত্র ৬০ সেকেন্ডে ১৩৪ বার ফুটবল আর্মরোলিং করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে প্রথমবারের মতো রেকর্ড গড়েন ফয়সাল। আগে এক মিনিটে ১২৭ বার বল ঘুরিয়ে যে রেকর্ডের মালিক ছিলেন রাশিয়ার ডেভিড র। এরপর তিনি বাস্কেট বল আর্মরোলিংয়ের অনুশীলন শুরু করেন। ইংল্যান্ডের মি. টমের এক মিনিটে ১২১ বারের রেকর্ড ভেঙে একই সময়ে দুই হাতের মধ্যে ১৪৪ বার বাস্কেট বল ঘুরিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান। তার এই সাফল্যে শুধু নিজ জেলায় কিংবা দেশে নয়, সারাবিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা তাকে নতুন রেকর্ড গড়ার পথ বাতলে দিচ্ছে। ফয়সালের ইচ্ছে, আগামীতে আরও নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্রি স্টাইলার ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুখ বিশ্বের সামনে আরও উঁচুতে তুলে ধরা।

আরও যত আলোচিত রেকর্ড!

জাতীয় সংগীতে বিশ্বরেকর্ড। ২০১৪ সালের স্বাধীনতা দিবসে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ জনের অংশগ্রহণে একসঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। সেদিন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে রাজধানীর তেজগাঁও জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়, 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।' লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। এ ছাড়া গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তালিকায় রিকশার নগরী হিসেবে স্থান পেয়েছে রাজধানী ঢাকা। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি রিকশা চলাচল করে ঢাকায়। ১৫ মিলিয়ন মানুষের শহর ঢাকার যাতায়াতের মোট ৪০ শতাংশ রিকশাকেন্দ্রিক। রাজধানী ঢাকায় পাঁচ লক্ষাধিক রিকশা চলাচল করে। পরিবেশবান্ধব এই বাহন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ২০১৫ সালে লিপিবদ্ধ হয়। 'লংগেস্ট সিঙ্গেল লাইন অব বাইসাইকেল মুভিং' ক্যাটাগরিতে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন ৩০০ ফিট রাস্তায় অংশ নেন এক হাজার ১৮৬ সাইক্লিস্ট। দুই হাজারের বেশি সাইক্লিস্টের তালিকা থেকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের নির্বাচিতরা এই সাইকেল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। বিডি সাইক্লিস্ট বাংলাদেশের ৪৭তম বিজয় দিবসে এমন আয়োজন করে। ১৮ জানুয়ারি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এর স্বীকৃতি দেয়। এর আগের রেকর্ডটি ছিল বসনিয়ার দখলে। এবার আপনার অপেক্ষায়। কবে গড়বেন নিজের রেকর্ড? 

মন্তব্য করুন