চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার এখন হয়ে উঠছে সংশোধনাগার হিসেবে। অপরাধ করে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ও হাজতিরা কারাগারে ঢুকে হয়ে উঠছেন শিল্পী। আর কাজ করে আয়ের মাধ্যমে হচ্ছেন স্বাবলম্বী। কাঠের দৃষ্টিনন্দন বড়-ছোট নৌকা, তাজমহল, হাতি, ঘোড়াসহ বিভিন্ন রকমের শোপিস, কাঠের-রাবারের টিস্যু বাক্স, মোড়া, নারীদের হাত ব্যাগ (পার্টস), এমনিক জুতা তৈরি করে টাকা আয় করছেন বন্দীরা।

কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ বন্দিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল হিসাবে তৈরি করছে। নতুন বন্দিরা হাতেকলমে শিখছেন এসব প্রশিক্ষণমূলক কাজ। আবার তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে কয়েদি ও সরকার উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। চট্টগ্রাম কারাগারে তৈরি করা এসব পণ্য বিপণনের জন্য কারা ফটকে ইতিমধ্যে একটি শোরুম তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ শোরুম থেকেই চট্টগ্রামসহ সারা দেশে কারাগারে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করা হবে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন বলেন, 'কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলতেই বহু কারিগরি ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। কারাগারে থাকা সব বন্দীকে পর্যায়ক্রমে এসব জিনিসপত্র তৈরির প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। মুক্তি পাওয়ার পর যাতে বন্দিরা বাইরে এসব কাজ করে ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারেন, সেই জন্য আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। বন্দীদের তৈরি জিনিসপত্র কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশপাশি সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করতে কারা ফটকে একটি শোরুম তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে উভয়েই লাভবান হবেন।'

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে সূর্য সেন ভবনের নিচতলায় হস্তশিল্পে ৪৪ জন, তাতঁ শিল্পে ৩৫ জন, কাঠের কাজে তিন জন, ইলিকেটনিক্স কাজে তিন জন, বই প্রস্তুত ও বাধাই কাজে এক একজন, জুতার কারিগর এক জন, টেইলারিং কাজে চার জন পুরনো কয়েদী প্রশিক্ষক হিসেবে সাধারণ বন্দিদের প্রশিক্ষণ দেন। পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় শোপিসও তৈরি করছেন। উৎপাদন শাখায় বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ জন কয়েদী ও হাজতি বন্দী কাজ করছেন। বন্দীদের কাউন্সিলিং করে তাদের নিজেদের আগ্রহে প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে কারাগারে তৈরি পণ্যের মধ্যে 'জেএমসু' এক জোড়া জুতা তৈরিতে খরচ পড়ে ৪০০ টাকা। সেটি বিক্রি করা হয় ৬০০ টাকায়। লাভের ২০০ টাকা দুই ভাগ করা হচ্ছে। এর একটি অংশ পাচ্ছেন জুতা তৈরি করা কয়েদিরা। এভাবে মোড়া ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকা, চালনি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা, ফুল ও ফলের ঝুড়ি ১০০ থেকে ২৫০ টাকা, পানদানি, কমলদানি ও ফুড কভার ৩০০ টাকার মধ্যে আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কয়েদিদের কাঠের তৈরি খাট ২২ হাজার টাকা, আলমারি ও ওয়ার্ডরোব ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ও ড্রেসিং টেবিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, টিস্যু বাক্স ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়, পাখি ২০০ টাকা, দৃষ্টিনন্দন বড় নৌকা এক হাজার টাকায়, ছোট নৌকার দাম পড়ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া মোড়া, পুঁতির ব্যাগ, বেতের চেয়ারসহ অন্যান্য পণ্যগুলো সাধারণ বাজার থেকে এখানে সুভল মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. নাশির আহমেদ বলেন, কারাগারে তৈরি করা পণ্যগুলোর গুণগতমান সাধারণ বাজারের তুলনায় কয়েকগুণ টেকসই ও উন্নত। কারণ এখানে বন্দিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি সামান্য কিছু অর্থ আয়ের মানসিকতা থেকে পণ্যগুলো তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণ বাজারে যা পুরোপুরি বাণিজ্যিক।

আদালতে হাজিরা দিতে আসলে কথা হয় অস্ত্র মামলার আসামি সাজিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছি। সহজেই জামিন পাবো বলে মনে হচ্ছে না। তাই কারাগারে হস্তশিল্পের উপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। আমি কাঠের নৌকার শোপিস বানানো শিখছি। এ কাজ করে প্রতি মাসে সামান্য কিছু টাকা আয় হচ্ছে। যা দিয়ে নিজের খরচটা মেটাতে পারছি।'

মাদক মামলার আসামি রইসুল আলম বলেন, 'আড়াই বছর আগে কারাগারে বন্দি হিসাবে ঢুকেছি। বাইরে মাদকের কারবারে যুক্ত ছিলাম। কোন নির্দিষ্ট পেশা ছিল না। এখানে জুতা তৈরির কাজ শিখলাম। মুক্তি পেলে জুতা তৈরি করে রিয়াজউদ্দিন বাজারে বিক্রি করে সহজেই সংসার চালাতে পারবো। কারাগার আমার জীবনটা স্বাভাবিক করে দিতে সহযোগিতা করছে।'

মন্তব্য করুন