বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল হওয়ায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে ২০ জুলাই নগরীর নাসিমন ভবনের সামনে নুর আহমদ সড়কে আয়োজিত এই সমাবেশে বিপুল লোকসমাগম ঘটিয়ে চমকে দেয় বিএনপি। সারাদেশই দলের কর্মকাণ্ডে যখন এক ধরনের স্থবিরতা, তখন এমন সমাবেশ দেখে অভিভূত হন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও।

সমাবেশে নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস দেখে তারা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আর দলীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ওই সমাবেশের সফলতাকেই পুঁজি হিসেবে দেখছেন চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা।

তবে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের পাশাপাশি আছে আতঙ্কও। কারণ দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। ফলে মামলার ভয় তাদের কাটছে না। তাই চট্টগ্রামের সমাবেশ সফল হলেও বিএনপি সারাদেশে কতটুকু সামনে এগোতে পারবে, তা নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে আছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব।

সমাবেশে অংশ নেওয়া দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, পাঁচজন স্থায়ী কমিটির সদস্য, বেশ কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাসহ কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশের প্রশংসা করেন।

সমাবেশের আগে ও পরে চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সমাবেশের সফলতা ধরে রেখে দলের নেতাকর্মীদের আরও চাঙ্গা করতে চট্টগ্রামের নেতাদের নির্দেশনা দেন তারা।

দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে উন্মুক্ত পরিসরে বড় কোনো সমাবেশ করতে পারেনি বিএনপি। ফলে বিএনপির এই সমাবেশ ঘিরে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। নগরীর কাজীর দেউড়ী মোড় কিংবা জেলা পরিষদ মার্কেট চত্বরে সমাবেশ করতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুমতি পায়। সেখানেই বড় সমাবেশ করে তাক লাগিয়ে দেয় দলটি।

চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর, দক্ষিণ, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে বিএনপি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক জেলা, মহানগর ছাড়াও অন্য ৯ সাংগঠনিক জেলায় সমাবেশের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সমাবেশের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জেলায় জেলায় চলে সভা-সমাবেশ। ভাঙতে শুরু করে মাঠের ভয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামে শীর্ষ বিএনপি নেতা ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'নির্যাতন-নিপীড়ন ও মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে সরকার বিএনপিকে দুর্বল করার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা পারেনি। বিএনপি এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী। পুড়তে পুড়তে নেতাকর্মীরা খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শত বাধা বিপত্তির পরও বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দিয়েছেন, সমাবেশ সফল করেছেন।'

দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামে সমাবেশ সফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবের রহমান শামীম, মহানগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। বিভিন্ন জেলার সিনিয়র নেতারাও সমাবেশ সফলে ভূমিকা রাখেন। এলাকায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন এই বিএনপি নেতারা।

মহানগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, 'চট্টগ্রামে যে সমাবেশ হয়েছে সেটাই এখন বিএনপির পুঁজি। এই পুঁজি হাতে রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা জানি, অনেক বাধা-বিপত্তি আসবে। কিন্তু অতীতের মতো চট্টগ্রাম থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হবে। শুধু বিএনপি নেতাকর্মীরাই নয়, জনগণও এই আন্দোলনে সাথী হবে। আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।'

দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কার্যালয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর নাসিমন ভবনের দলীয় ক্লাবের সামনে নুর আহমদ সড়কে উন্মুক্ত পরিসরে সমাবেশ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরপর থেকে উন্মুক্ত পরিসরে ফ্রন্ট, জোট কিংবা দলের ব্যানারে কোনো সমাবেশ করতে পারেনি বিএনপি। এই হিসেবে দীর্ঘ ২৬৬ দিন পর উন্মুক্ত পরিসরে সমাবেশ করল দলটি।

এদিকে ঘুরে দাঁড়াতে স্বপ্ন দেখলেও প্রকৃতপক্ষে দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভয়ে মামলা আতঙ্ক কাটছে না। বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। যুবদল ও ছাত্রদলসহ দলটির অন্যতম অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অনেকেই মামলার আসামি। আদালতে হাজিরা ও জামিন নেওয়াতে সময় কাটছে তাদের। ফলে নেতারা মুখে নির্ভয়ের কথা বললেও ভয় কাটছে না সাধারণ নেতাকর্মীদের। এই ভয় নতুন মামলায় জড়ানোর ভয়।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী সমকালকে বলেন, 'মামলা-মোকদ্দমায় ফেঁসে গিয়ে চরম দুঃসময় পার করছেন নেতাকর্মীরা। এরপরও তারা মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান।

কিন্তু একেকজনের বিরুদ্ধে এক থেকে ৫০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে দিতেই তারা কাহিল। আর তাদের এ অবস্থা দেখে অন্যরা সাহস পাচ্ছেন না। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি কিছুটা হতাশও।

মন্তব্য করুন