গ্রামের মাদ্রাসা তো বটেই, চট্টগ্রাম শহরের সিংহভাগ মাদ্রাসায়ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। অনেক মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীতকে বলা হয় জাতীয় গীত। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কেন জাতীয় সঙ্গীত গাইতে দেওয়া হয় না? এর উত্তরে অনেক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অকপটে বলে, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নাজায়েজ, কারণ এটি 'হিন্দু কবি' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন। যেখানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না, সেখানে 'জয়বাংলা' স্লোগান দেওয়া বা বঙ্গবন্ধু শব্দটা উচ্চারণ করাও কঠিন একটা কাজ। আর সেসব মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতন বা জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলা তো অসম্ভব কাজ। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন একজন নারী, একজন সাহসী নারী জিনাত সোহানা চৌধুরী।

সুচিন্তা বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম বিভাগের ব্যানারে গত তিন বছর ধরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি 'জঙ্গিবাদবিরোধী আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশ' করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম নগর ও মফস্বলের শতাধিক মাদ্রাসায় এই সচেতনতা সমাবেশ করেছেন। এর মধ্যে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশে অতিথি হিসেবে রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকেন।

ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা নানুপুর আল জামেয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া মাদ্রাসা, নগরীর বাকলিয়ার জামেয়া হাফেজুল উলম আল ইসলামিয়ার মতো অসংখ্য মাদ্রাসায় তিনি এই সমাবেশ করেছেন। এমনকি জামায়াত অধ্যুষিত সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েও তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জয়বাংলা স্লোগান দিয়েছেন, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। এসব মাদ্রাসায় অতীতে এসব কল্পনারও বাইরে ছিল।

সর্বশেষ তিনি সাম্প্রতিক আলোচিত বিষয় শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতন ও গুজবের বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছেন নগরীর বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসায়।

এসব সমাবেশে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন। জিনাত সোহানার সবচেয়ে বড় সাফল্য যেসব মাদ্রাসায় কখনও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়নি, সেখানে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। জাতীয় সঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ভুল ধারণা ছিল সেসব তিনি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা জিনাত সোহানা চৌধুরী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক। 'সুচিন্তা বাংলাদেশ' নামে একটি সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ক তিনি। সেই সংগঠনের হয়েই বিভিন্ন মাদ্রাসায় কর্মসূচি পালন করেন তিনি। জিনাত চট্টগ্রাম জেলা আদালতে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর। তার বাড়ি রাউজান উপজেলায়।

জিনাত সোহানার কাছে প্রশ্ন ছিল- শতাধিক মাদ্রাসায় 'আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশ' করে তিনি কি কোন সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছেন? উত্তরে জিনাত বলেছেন, 'সাফল্য আসছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কোমলমতি। তাদের যা শেখানো হয় তাই তারা মনে করে। কিন্তু আমরা যখন তাদের বোঝাই, তারা তখন বোঝে। যেমন ধরুন, শিক্ষার্থীরা মনে করে জাতীয় সঙ্গীত লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি হিন্দু, তাই এই সঙ্গীত গাওয়া নাজায়েজ। কিন্তু আমরা যখন বলি, আমরা বিদেশি ওষুধ খাই, সেসবের বেশিরভাগ তো অন্য ধর্মাবলম্বীদের তৈরি, তাহলে সেটা আমরা খাচ্ছি না? আমরা কি ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি না? সেখানে আমাদের অন্য ধর্মের ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন না? তা কি নাজায়েজ? এসব যুক্তি শোনার পর কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়, তাদের ভুল ভেঙে যায়।'

একজন নারী হয়ে এই যে বিভিন্ন মাদ্রাসায় যাচ্ছেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, ভয় লাগে না? এমন প্রশ্নের জবাবে জিনাত সোহানা বলেন, 'মাদ্রাসায় যাওয়া অনেক ঝুঁকিপূর্ণ, ভয়ও লাগে। কিন্তু সমাজের জন্য, দেশের জন্য কাজ করতে গেলে ভয়কে জয় করতে হয়।' সত্যি, জিনাত তাই করে যাচ্ছেন।

জিনাত সোহানা বলেন, মাদ্রাসায়ও অনেক প্রগতিশীল ও আধুনিক ধ্যান-ধারণার শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছে। আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশে তারা অনেক সহায়তা করেন। মাদ্রাসার আলেমরা যখন যুক্তি দিয়ে বলেন, ধর্মের নামে বোমা মারা, মানুষ হত্যা করা মহাপাপ, তারা যখন  কোরান-হাদিসের আলোকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বয়ান দেন, তখন কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়। তাদের অনেক ভুল ধারণা দ্রবীভূত হয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, মাদ্রাসায় সচেতনামূলক কাজ করার কারণ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে পারলে, আধুনিক শিক্ষায় গড়ে তোলা গেলে তাদেরকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা যাবে। একজন মাদ্রাসা ছাত্রও তখন বিসিএস দেবে, সরকারি চাকরি করতে পারবে। তাতে করে দেশ ও সমাজের উপকার হবে। তাই তিনি মাদ্রাসায় কাজ করে যাচ্ছেন।

মাদ্রাসায় এসব কাজ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন না? এমন প্রশ্নের জবাবে জিনাত সোহানা চৌধুরী বলেন, 'অনেক বাধা আসে। অনেক অপপ্রচার করে। এমনও হয়েছে-জাতীয় সংগীত গাইবার সময় দেখা গেল কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মাঝপথেই (ওয়াকআউট) চলে গেল। আবার অনেক হুমকিও আসে। কিন্তু আমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বোঝানোর চেষ্টা করি। তাদের সাথে যুক্তি দিয়ে কথা বলি। তখন তারা বিষয়টা বোঝেন। মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহায়তা করেন।

এই কাজের পেছনে কি কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে? এম প্রশ্নে জিনাত সোহানা এককথায় বলে দেন-তার কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তার একমাত্র উদ্দেশ্য, যেসব মাদ্রাসায় কখনো জয়বাংলা উচ্চারিত হয়নি, সেখানে হাজার শিক্ষার্থীর সমবেত কণ্ঠে জয়বাংলা স্লোগান দেওয়া। তার লক্ষ্য-যে মাদ্রাসায় কখনো বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়নি, সেখানে বঙ্গবন্ধু নামটি ছড়িয়ে দেওয়া। যে মাদ্রাসায় কখনো জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়নি, সেখানে জাতীয় সংগীত গাইয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করা। জিনাত বলেন, তাকে এই কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন সুচিন্তা বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান আরাফাত রহমান।

জিনাত আরো বলেন, 'আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশ থেকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল করার। প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিয়ে তাদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কাজে হাত দিই।'

সর্বশেষ বুধবার নগরীর বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসায় 'জঙ্গিবাদ বিরোধী আলেম-ওলামা শিক্ষার্থী সমাবেশে' করেন তিনি। সমাবেশে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হক, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুল হক, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান, বাংলা নিউজের ব্যুরো এডিটর তপন চক্রবর্তী, নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শফিক আদনান, সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডবলমুরিং জোন) আশিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে মোনাজাত পরিচালনা করেন পীরে তরিকত, বাহরুল উলুম আলহাজ হজরত মাওলানা কুতুব উদ্দীন।

জিনাত সোহানা বলেন, ' 'জঙ্গিবাদ বিরোধী আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশ শুরু হয় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের বিপল্গবী স্লোগান জয় বাংলা এবং জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে আমরা শেষ করি।'

মন্তব্য করুন