দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য অ্যাক্সেসিবল ই-লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে অনন্য নজির স্থাপন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। বর্তমানে ১০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ই-লার্নিং সেন্টার থাকায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আর কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করতে হয় না। তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করছেন।

গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইপসা ও একে খাঁন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এই সেন্টার স্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নিচতলায় অবস্থান এই সেন্টারটির।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ই-লার্নিং সেন্টারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, অ্যাক্সেসিবল ডিকশনারি, দুই শতাধিক ডিজিটাল টকিং বুক, ৩০০ ই-বুক, ৫০টির বেশি ব্রেইল বই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার ফলে তা একদিকে যেমন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর করছে, অন্যদিকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিচ্ছে। আমাদের দেশে দৃষ্টিমান ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, প্রযুক্তিই পেরেছে সেই ব্যবধানটুকু কমিয়ে আনতে।

ই-লার্নিং সেন্টারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে ই-লার্নিং সেন্টারের প্রশিক্ষক রাশেদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, 'আমি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি তখন ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়তাম। এই পদ্ধতিতে পড়াশোনার ব্যাপারটা কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে আমাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট লাঘব হচ্ছে পড়াশোনার ক্ষেত্রে। এই ই-লার্নিং সেন্টারে প্রযুক্তির সহায়তায় নিয়মিত ১১০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান সেরকমভাবে এই সেন্টার থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। এখানে প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীরা বেশ উচ্ছ্বসিত, প্রযুক্তির ছোঁয়া পেয়ে। আমি একজন প্রশিক্ষক হিসেবে বলতে চাই এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর তাদের কেউ আটকে রাখতে পারবে না।'

বিশ্বনাথ রায় এসেছেন সুদূর লালমনিরহাট থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন তিনি। একরাশ স্বপ্ন নিয়ে চবিতে ভর্তি হন তিনি। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনায় অভ্যস্ত হলেও বর্তমানে প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। চবিতে অ্যাক্সেসিবল ই-লার্নিং সেন্টার হওয়ায় স্বপ্ন পূরণে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন বিশ্বনাথের মতো অনেক দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী।

ই-লার্নিং সেন্টার থেকে কী সুবিধা পাচ্ছেন- তা জানতে চাইলে বিশ্বনাথ বলেন, চোখের আলোতে নয়, মনের আলোয় আমরা শিখি। প্রযুক্তির সাহায্য এই ই-লার্নিং সেন্টারে আমরা ইন্টারনেটে যে কোনো তথ্য পাচ্ছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালাতে পারছি, অনায়াসে শিক্ষা লাভ করতে পারছি স্ট্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে। আমাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সুদৃষ্টি ধন্যবাদযোগ্য। আমরা রাষ্ট্রের বোঝা হতে চাই না। আমার প্রত্যাশা ভবিষ্যতে সরকারি এবং বেসরকারি অফিসগুলোতে প্রযুক্তিগত কাজগুলো আমরা নিজেরাই সম্পাদন করতে পারব কারও সাহায্য ছাড়াই। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিশ্বকে একদিন জয় করব আমরা।' ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী হামিদা আক্তার নিশা বলেন, 'ই-লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে আমরা আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে পারছি। এই সেন্টার যদি না হতো আমরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতাম। এই সেন্টারের একজন সদস্য হতে পেরে আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করছি।'

ই-লার্নিং সেন্টারের সাফল্য এবং চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বে) ড. শিরীণ আখতার সমকালকে জানান, 'ওরা আমাদের সন্তানের মতো। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর রাখছি আমরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা ইনক্লুসিভ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করেছি গত বছর। আমাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতায় রাষ্ট্রের বোঝা না হয়ে রাষ্ট্রের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে বিবেচিত হবে, আমি এই আশা করি।'

মন্তব্য করুন