ফসলি জমির টপ সয়েল কাটা হচ্ছে, ফসল উৎপাদন কমে গেছে, কৃষকরা অসহায়

৩ কিলোমিটারে ৩০ ইটভাটা

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯      

চন্দনাইশ সংবাদদাতা

 ৩ কিলোমিটারে ৩০ ইটভাটা

পরপর তিনটি ইটভাটা। ইটভাটার পাশেই জনবসতি ও ফসলি জমি। সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকায় ইটভাটার কারণে অসহনীয় হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা -সমকাল

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকানের উত্তর দিক থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার এলাকায় সম্পূর্ণ ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ৩০টি ইটভাটা। পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় পরিবেশ ধ্বংসকারী এসব ইটভাটা গড়ে উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অনেকটা বিনা বাধায় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কৃষিজমি ধ্বংস করে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটা এখন গিলে খাচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমির টপসয়েল। যন্ত্রদানব এক্সক্যাবেটরের সাহায্যে ৪০-৫০ ফুট গভীর করে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। ইট পোড়ানোর জন্য ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল।

উপজেলার কালিয়াইশ, কেউছিয়া ও নলুয়া ইউনিয়নে কিছু অংশজুড়ে এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া পাহাড়ি অঞ্চল চুড়ামণি, ছনখোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৮-৩০টিসহ প্রায় ৬০টিরও অধিক ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে পুরো উপজেলায়।

স্থানীয় কৃষক আবদুর রহমান, সৈয়দ মিয়া জানান, এ অঞ্চলের কৃষকদের দারিদ্র্যকে কাজে লাগিয়ে একাধিক অসাধু মাটি ব্যবসায়ী ও দালাল চক্র টাকার লোভ দেখিয়ে স্বল্পমূল্যে আবাদি জমির মাটি কিনে ইটভাটায় সরবরাহ করে। কৃষিজমির মূল্যবান এই মাটি 'টপ সয়েল' কেটে নিয়ে গেলেও উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে নেওয়ায় এখন এসব কৃষি জমিতে ফসল উৎপাদন হয় না। কারণ জমির উপরিভাগের দেড় থেকে ২ ফুট অংশের মধ্যেই মাটির মূল উর্বরা শক্তি থাকে। এই মাটি কেটে নিয়ে নেওয়ায় জমি তার উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

জানা গেছে, ৩০টি ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৯টির। সরেজমিন দেখা যায়, সকাল-বিকেল-রাতে জমির টপ সয়েল কেটে তা ট্রাকে ট্রাকে পরিবহন করা হয় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওপর দিয়ে। এতে বর্ষা মৌসুমে সড়ক মাটি পড়ে পিচ্ছিল হয়ে যায়। তাতে ঘটে দুর্গঘটনা। মাটি পরিবহনের সময় মহাসড়কের ওপর পড়া মাটি জমাট বেঁধে থাকে। ফলে বর্ষার শুরুতে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। পুরো মহাসড়ক পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হয়। অনেক সময় মহাসড়কের ওপর মাটি জমাট বেঁধে থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শত শত যানবাহন আটকা পড়ে যায়। বেড়ে যায় দূর-দূরান্তের যাত্রী ও পর্যটকদের দুর্ভোগ।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মৌলভীর দোকান থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত স্থানে একটার সাথে একটা ঘেঁষাঘেঁষি করে গড়ে উঠেছে ৩০টি ইটভাটা। গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার পাশে মৌলভীর দোকান অংশে রয়েছে উত্তর সাতকানিয়া জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজ, রসুলাবাদ ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাসহ শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া এসব ইটভাটার চারপাশে রয়েছে বিশাল জনবসতিপূর্ণ এলাকা।

বর্তমানে বিস্তীর্ণ কৃষিজমির বুকে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় জলাশয়। শুধু মাটি কেটেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না এসব ইটভাটা মালিকরা। টপ সয়েল কাটার পাশাপাশি পাশের বনাঞ্চল উজাড় করে ইট পোড়ানোর প্রধান কাঁচামাল লাকড়ি সংগ্রহ করা হয়। তবু বনবিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে কয়েক বছরের ব্যবধানেই বদলে গেছে এ অঞ্চলের পরিবেশ। এতে হুমকির মুখে পড়েছে ফসল উৎপাদন, বাড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ইটভাটার ধুলা ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, ব্রংকিউলাইটিসসহ নানা ধরনের চর্মরোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধুলা ও ধোঁয়ার দূষণে সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, এ অঞ্চলে সরকারি খাসজমি দখল করেও বেশ কয়েকটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। যে হারে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে ইতিমধ্যে ইটভাটার কয়েক কিলোমিটার আশপাশে ফসল উৎপাদনও অনেকাংশে কমে এসেছে বলে জানান কৃষকরা। ফসল উৎপাদন করতে না পেরে এক প্রকার বাধ্য হয়েই জমিগুলো ইটভাটা মালিকদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনক কৃষক অভিযোগ করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে সমকালকে বলেন, গোটা চট্টগ্রাম বিভাগে ৪১৯টির মতো ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় কয়টি ইটভাটা ও কয়টি ইটভাটার ছাড়পত্র আছে তা তিনি জানাতে পারেননি।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, উপজেলায় ৯টির মতো ইটভাটার লাইসেন্স রয়েছে। বাকিগুলোর মালিকদের অনেকেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। আবার অনেকে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নিয়ে ইটভাটা চালু রেখেছেন। তবুও রিট পিটিশনের নির্দেশনা মতে, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় কয়েক লাখ টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত আছে।