ভরা বর্ষায়ও মরণদশা চেংগীর

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯      

পানছড়ি (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা

ভরা বর্ষায়ও মরণদশা চেংগীর

পাহাড়ি ঢলের কারণে ভরাট হয়ে গেছে চেংগী নদী। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ভরা বর্ষায়ও নদীতে পানি নেই-সমকাল

এখন ভরা বর্ষা। অথচ বর্ষার কোনো লক্ষণ নেই পানছড়ির চেংগী নদীতে। নদীর বুকে নেই পানির স্রোতধারা। দেখলে মনে হয় যেন কোনো এক মরা নদী। অব্যাহতভাবে বাঁশ-গাছ কেটে বন উজাড় করার কারণে পাহাড়ি ঢলে ভরাট হয়ে গেছে চেংগী নদী। আবার জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ে কমে গেছে বৃষ্টিপাত। তাই মরে যাচ্ছে চেংগী নদী।

স্থানীয়রা জানায়, গত কয়েক দশক ধরে অব্যাহত গাছ-বাঁশ কাটার ফলে মরণদশা হয়েছে চেংগী নদীর।

সত্তর ও আশির দশকে পানিতে টইটম্বুর ছিল এই নদী। গভীরতা ছিল অনেক। চলত শত শত নৌকা। সড়ক যোগাযোগ সুবিধা না থাকায় মালপত্র পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। নৌকায় মালপত্র পরিবহন করতেন ব্যবসায়ীরা। এখন নৌকা চলা তো দূরের কথা, ধান চাষের জন্যও পানি পাচ্ছেন না কৃষক। নদীর দু'পাড় এখন শুধু বালুচর। এই বর্ষায়ও এককালের প্রমত্ত চেংগী নদী হেঁটে পার হয় এলাকাবাসী।

অভিজ্ঞ মহলের ধারণা- অব্যাহত কাঠ, বাঁশ কাটা, জুম চাষের পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হওয়ার কারণে পাহাড় ন্যাড়া হয়ে পড়েছে। মাটি ক্ষয় হয়ে চেংগী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। তাই উপজেলার চেংগী নদী, পূজ গাং নদী, তারাবন ছড়া নদীর এখন মরণদশা। বৃষ্টির পানির সঙ্গে পাহাড়ের মাটি আর বালু এসে নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই বন্যায় প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। দেখা দেয় তীর ভাঙন।

পানছড়ি উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অরুণাংকর চাকমা বলেন, 'বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে আষাঢ় মাসেও বৃষ্টির দেখা পাচ্ছেন না পাহাড়ের মানুষ। তাই চেংগী নদী, পূজগাং নদীসহ উপজেলার বিভিন্ন নদীগুলোতেও পানি প্রবাহ কমে গেছে। তাই কৃষকরা প্রয়োজনীয় পানির অভাবে কৃষিকাজ করতে পারছেন না।

পানছড়ি উপজেলার বৃদ্ধ মধু মঙ্গল কার্বারী ও করপ চন্দ্র কার্বারী বলেন, 'সত্তর ও আশির দশকে চেংগীতে নৌকা চলত। মালপত্র পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। রাঙামাটি, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, পানছড়ির ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে মালপত্র পরিবহন করতেন। আমরাও নৌকায় করে রাঙামাটি আসা-যাওয়া করতাম। তখন পানিতে পরিপূর্ণ ছিল চেংগী নদী।'

পানছড়ি উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বকুল চন্দ্র বলেন, 'পাহাড়ে আগের মতো গাছ, বাঁশ নেই। বনদস্যুদের কারণে এমন দশা হয়েছে। মাটি ক্ষয় হয়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে। এলাকার আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে। গরমকালে অতিরিক্ত গরম, শীতকালে অতিরিক্ত শীত পড়ে। বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো বৃষ্টি হয় না।

খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী বলেন, 'পানি সুরক্ষার জন্য পানছড়ি উপজেলায় রাবার ড্যাম বসানো হলেও পরিবেশ সুরক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একদিকে বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব আর রাবার ড্যামের প্রভাবে চেংগী নদীর এ অবস্থা হয়েছে। বর্ষায় নদীর দু'পাড় ভেঙে যাচ্ছে। পাড় ভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে উপকারের পরিবর্তে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষক।'