'শূন্য লাগে এই ধরণী বিপুল'

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯

হাসান শাহরিয়ার

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক বন্ধুত্ব কি-না জানি না। তবে বয়স বন্ধুত্বের কোনো মাপকাঠি নয়। মনের মিল, অন্তরের গভীরতা ও প্রশস্ততা, একে অপরের আনন্দে তৃপ্তি লাভ করা, দুঃখে ব্যথিত হওয়া এবং সর্বোপরি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব পোষণকেই বন্ধু, সখা কিংবা সুহৃদ বলা যেতে পারে। 'পশ্চিমা দর্শনশাস্ত্রের জনক' গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের অমোঘ বাণী :'বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব মানে পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা, বন্ধুত্ব মানে বিপদে পাশে থাকা, সুখে-দুঃখে এক থাকা।' আমার এমনি একটি সুগভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও লেখক ড. মীজানুর রহমান শেলীর সঙ্গে। আমাদের সম্পর্ক 'জীবনের কোনো বাঁকে' গিয়ে শেষ হয়নি, এর ব্যাপ্তি ছিল জীবনভর। এ ব্যাপারে আমার 'অতীত অতীত নয়' (২০১৩) বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, 'স্নেহভাজন, অনুজপ্রতিম, সদাশয়, সদালাপী ব্যক্তিত্ব হাসান শাহরিয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। এ সময় ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল ও উত্তাল। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের দোলাচল এই চঞ্চলকালের অধিবাসী আমাদের সবাইকেই এনে দিয়েছে বিচিত্র ও বর্ণিল অভিজ্ঞতা।' ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও শ্রেণিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে সমাজে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। ১২ আগস্ট পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন ব্যাধিতে ভুগছিলেন। সর্বশেষ হাসপাতাল যাত্রায় তিনি আইসিউইয়ে ছিলেন। চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেখা হয়নি। এই খেদ আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘুচবে না। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালে পৈতৃক নিবাস ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের কুসুমপুর গ্রামে। কয়েকবারই তাঁর সঙ্গে ছবির মতো এই ছায়াঢাকা গ্রামে গিয়েছি কখনও বেড়াতে, কখনও-বা কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তাঁর শৈশব কেটেছে কুসুমপুর ও কলকাতায়। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতার একটি স্কুলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মীজানুর রহমান শেলী ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। ইন্টারমিডিয়েট, অনার্স এবং এমএ পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়েছিলেন। তিনি ছাত্র সংগঠন 'ছাত্র শক্তি'র সভাপতি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবেও কাজ করেন। ছাত্রজীবন শেষ হলে (১৯৬৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন (১৯৬৪-৬৭)। তারপর সারা পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তিনি প্রশাসনিক ক্যাডারে (সিএসপি) যোগ দেন। আমলা জীবনে (১৯৬৭-৮০) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহকুমা অফিসার (এসডিও) এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। নারী জাগরণ এবং যুব উন্নয়নে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়ে রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁকে কাছে টেনে নেন। জেনারেল জিয়া চেয়েছিলেন শেলী যেন রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তাঁর হস্ত শক্তিশালী করেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা উৎসাহ ছিল না। তিনি বলতেন, 'রাজনীতি করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। পাস করে বের হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি।' এটাই তাঁর জীবনে কাল হয়ে দেখা দিল। উপসচিব পদমর্যাদার একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর ঘনিষ্ঠতা তাঁর সিনিয়ররা স্বভাবগত কারণে সহ্য করতে না পারায় শুরু হলো ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রপতি ও তাঁর মধ্যে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হলো। অবশেষে তিনি বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন (১৯৮০)। হেলিকপ্টারে বসে জিয়া ড. শেলীর পদত্যাগপত্র অনুমোদন করেন। এখানেই সমাপ্ত হলো তাঁর সংক্ষিপ্ত আমলা জীবন। এ জন্য শেলীর কোনো আফসোস ছিল না।

এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন ড. মীজানুর রহমান শেলী। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তিনি লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে 'আন্তর্জাতিক রাজনীতি' বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। হঠাৎ একদিন শুনলেন, তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সিনিয়রদের (পাকিস্তানি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যদি দূষণীয় হয়ে থাকে, তাহলে তো বাংলাদেশ সরকারের অধিকাংশ অফিসারেরই নাগরিকত্ব থাকে না। তিনি নিজে দৈনিক নিউ এজ পত্রিকায় লিখেছেন, বাংলাদেশের স্থপতি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সচিব ড, ফরাসউদ্দিনের (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর) পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর শিক্ষক প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী ও মীজানুর রহমান শেলী গণভবনে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে স্বাগত জানান। মীজানুর রহমান শেলীর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'যেসব ছাত্রনেতা ১৯৬২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মানিক মিয়ার বাসভবনে নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করেছিল, তাদের মধ্যে কি তুমিও ছিলে?' বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে বিমোহিত হয়ে শেলী 'হ্যাঁ'সূচক জওয়াব দিয়ে বললেন, 'আইয়ুব খানের কুখ্যাত শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলনে তাঁর পরামর্শ চাইতে গিয়েছিলাম। আরও ছিলেন ছাত্রলীগের শেখ ফজলুল হক মনি, ইস্ট পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কাজী জাফর আহমদ ও জয়নাল এবং এনএসএফের আবুল হাসনাত।' বঙ্গবন্ধু জানালেন, 'কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপে এই জঘন্য ষড়যন্ত্র থেকে শেলী বেঁচে গেলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, 'আমার ধারণা ছিল, তুমি একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এবং পাকিস্তানিরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে তোমাকে কাজে লাগিয়েছে। মেঘ কেটে গেছে। মিথ্যা অভিযোগ থেকে তুমি খালাস পেয়েছ। লেখাপড়া শেষ করে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করো।'

ড. মীজানুর রহমান শেলীর জ্ঞানের পরিধি ছিল আকাশচুম্বী। যে কোনো বিষয়ে সৃষ্টিশীল লেখা তৈরি করা কিংবা ভাষণ প্রদান ছিল তাঁর বাঁ হাতের খেলা। অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডারের অধিকারীদের পক্ষেই তা সম্ভব। এত সব সত্ত্বেও তিনি ছিলেন বৈঠকি, আড্ডাবাজ ও অনর্গল বক্তা। প্রায় প্রতিটি কথার সঙ্গেই একটি করে কৌতুক জুড়ে দেওয়া ছিল তাঁর মজ্জাগত স্বভাব। একদিন সাংবাদিক বন্ধু আমিনুর রহমান ও আমি ঢাকা ক্লাবে ঢুকে দেখি সাদেক খান, কবি ও সাংবাদিক ফয়েজ আহ্‌মদ, আসাদুল হক এমপি ও মীজানুর রহমান শেলী এক টেবিলে বসে আড্ডা মারছেন; কিন্তু কেউ কারও কথা শুনছেন না। কারণ তাঁরা সবাই ছিলেন অনর্গল কথক। আমরা বললাম, 'আপনারা তো সবাই বক্তা, শ্রোতা কোথায়?' প্রয়াত এই চার অগ্রজপ্রতিম হেসে আমাদের বসার জায়গা করে দিলেন। তাঁর বিদেশি শত ভক্তের মধ্যে একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্টিন মুলিগান। শেলীর মৃত্যু সংবাদে মুলিগান বলেছেন, 'স্বর্গে শেলীর সঙ্গে দেখা হলে অনেক হাস্যরসাত্মক কথা শুনতে পাব।' কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) মাল্টা সম্মেলনে (২০১২) অতিথি বক্তা হিসেবে শেলীর মধুর, রসাল ও জ্ঞানগর্ভ ভাষণের কথা এখনও ভোলেননি সংগঠনের সভাপতি মহেন্দ্র ভেদ, প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস মারি বার্ট ও রিটা পাইন, সহসভাপতি ক্রিস কব ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়ন্ত রায় চৌধুরী। এ সম্পর্কে শেলী সম্পাদিত 'হাসান শাহরিয়ার :সাংবাদিকতায় জীবন্ত কিংবদন্তি' (২০১৮) পুস্তকের মুখপত্রে তিনি লিখেছেন, '২০১২ সালে মাল্টায় সিজেএ সম্মেলনে শাহরিয়ার আমাকে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অন্য দু'জন অতিথি বক্তা ছিলেন ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাবেক সম্পাদক সুনন্দ দত্ত রায় এবং পাকিস্তানের দৈনিক ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস। আমার স্ত্রী সুফিয়া আমার সঙ্গে গিয়ে মাল্টার আকর্ষণীয় প্রকৃতি অবলোকন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেটাই ছিল তাঁর শেষ বিদেশ সফর। ২০১৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। নীল ভূমধ্যসাগর তীরের মাল্টাকে ওই সম্মেলন যেন আরও আলোকিত করে তুলেছিল। সাংবাদিকতার ইতিহাসে সেই সম্মেলন একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে বৈকি। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সাংবাদিকদের এমন সম্মেলন আর কখনও সেখানে হয়েছে বলে মনে হয় না। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বহুজাতিক এই সম্মেলনের সফলতা লাভ সম্ভব হয়েছিল কেবলই হাসান শাহরিয়ারের অদম্য চেষ্টায়। তিনিই ছিলেন এর কাণ্ডারি।'

হরেণ দাস নামে এক গণক তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনি মন্ত্রী হবেন।' হয়েওছিলেন এরশাদের আমলে। এক ব্রিটিশ নারী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, 'আপনার চারদিকে টাকা ঘুরতে থাকবে।' শেষ বয়সে তিনি একটি লিজিং কোম্পানির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। বোধকরি এরই ইঙ্গিত ছিল ওই ভবিষ্যদ্বাণীতে। অনেকটা নীরব ও নিভৃতেই চলে গেলেন এই সজ্জন। এত মহৎ গুণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও জীবদ্দশায় তাঁর মূল্যায়ন হয়নি। বাংলা একাডেমি তাঁকে 'সম্মানজনক ফেলো' প্রদান করলেও কোনো সরকারই তাঁকে একুশে পদক পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত করেনি। এ প্রসঙ্গে গানের কথাই অকাট্য :'জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা/মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল/মুখপানে যার কভু চাওনি ফিরে/কেন তারি লাগি আঁখি অশ্রু আকুল?' এই কবির কথায়ই বলতে হয়, 'চিরদিন তুমি যারে দিয়েছ হেলা/হৃদয় নিয়ে শুধু খেলেছ খেলা/মরণে তারে আজি বলো গো কেন/শূন্য লাগে এই ধরণী বিপুল।' তিনি দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।

আমাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ড. শেলী চিরবিদায় নিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমার প্রেরণার অন্যতম উৎস। আমি একজন হিতৈষী ও অভিভাবককে হারালাম। উপদেশ ও সৎপরামর্শ দেওয়ার জন্য কেউ আর অবশিষ্ট থাকল না।
 
প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্নেষক সিজেএ ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি