বরিস জনসনের কঠিন ব্রেক্সিট যুদ্ধ

মত ও মন্তব্য

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

হারুন হাবীব

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে ডেভিড ক্যামেরনের পরাজয় ঘটে গণভোটে, যাতে কট্টরপন্থিরা বিজয়ী হয়, প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। এরপর ২০১৬ সালের জুলাই মাসে কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা হিসেবে তেরেসা মে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন। ঘটনাচক্রে তখন আমি লন্ডনে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মের পদত্যাগের পর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন সুপরিচিত কট্টরপন্থি বরিস জনসন। কাকতালীয় হলেও পরিবারের লোকদের সঙ্গে বছরান্তে সময় কাটাতে সে সময়টাতেও আমি ইংল্যান্ডে। এই দুই ঘটনার মধ্যকার সময়টার দিকে পৃথিবীসুদ্ধ মানুষের দৃষ্টি ছিল ব্রিটেনের দিকে: কীভাবে এবং কতটা যোগ্যতায় যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন ব্রেক্সিটপর্ব সম্পন্ন করে।

দৃঢ় মনোভাব নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তেরেসা মে, ব্রেক্সিট করেই ছাড়বেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের পার্থক্য নির্ণয় করবেনই। মোদ্দা কথা, ব্রিটেন তো ব্রিটেনই, এককালে গোটা বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, যার উপনিবেশে সূর্য অস্ত যায়নি, আজ অবস্থা যাই হোক না কেন। কিন্তু কপাল প্রসন্ন হয়নি তেরেসা মের। বলা যায় গণভোটের পর থেকে দেশের গণমানসে ইউরোপবিহীন ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ চিন্তা বেশি করে দানা বাঁধতে শুরু করে। এককালের উগ্রপন্থিদেরও কেউ কেউ আবার নতুন উপলব্ধিতে ভাস্বর হয়। দিন যত যেতে থাকে, ব্রেক্সিটের কর্মসাধন ততই কঠিন হতে থাকে। পার্লামেন্টে বারকয়েক চেষ্টা নিয়েও কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন না তেরেসা মে। লেবার দলের প্রতিপক্ষরা তো আছেই, টোরি দলের বহু সদস্যও সরকারের ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদন করেন না। শত অনুরোধ-উপরোধেও কাজ হয় না।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুততার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্নে তাগিদ দিতে থাকে। ব্রিটেনের নিজস্ব সংকটে বা অনুরোধে সম্ভাব্য চুক্তির সময়সীমাও বাড়ানো হয় কয়েকবার। সর্বশেষ তারিখ নির্ধারিত হয় ৩১ অক্টোবর। অর্থাৎ চলতি বছরের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে হয় চুক্তি সস্পাদন করতে হবে, নয় চুক্তি ছাড়াই ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এতে বাণিজ্য, কলকারখানার জনবল ইত্যাদি নিয়ে যে সংকট হবে, বলা বাহুল্য। অতএব, গণভোটে জিতেও তেরেসা মের সরকার অসহায় হয়ে পড়ে। দেশের পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া সামনে এগোনো সম্ভব নয়। পরিশেষে অপমানিত-বিপদস্ত তেরেসা মে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিতে দলের নতুন নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বরিস জনসন।

এককালের লন্ডনের মেয়র ও মে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে বরিস জনসনের কট্টরপন্থি ইমেজ যেমন দলে আছে, তেমনি আছে বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুলালোচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার মিল খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট হয় না বলেই কেউ কেউ জানান। ট্রাম্পেরও দারুণ পছন্দের লোক জনসন। যা হোক, সেসব না হয় ব্যক্তি রুচি বা নীতি-নৈতিকতার ব্যাপার। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান বিশ্বে উগ্রবাদিতার পক্ষে জয়ডঙ্কা বাজানোর চেষ্টা থেমে নেই, বরং সে ডঙ্কা প্রায়শই সীমা ছাড়িয়ে বেজে চলেছে নানা আঙ্গিকে। ভয়ঙ্কর সে দামামায় বিশ্বের নানা অঞ্চলের দেশগুলোতে উগ্রবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করছে। এসব উগ্রবাদী রাষ্ট্রশক্তির কল্যাণে বহু দেশ ও সমাজে নিষ্ঠুরতা বাড়ছে, মনুষ্যত্ববোধের পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে সভ্যতা-বিবর্জিত নীতি-অনুশাসন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই উগ্রবাদী বিজয়যাত্রার একটা শেষ থাকতে হবে, হবেই হবে; অন্যথায় পৃথিবীকে সভ্য মানুষের বাসযোগ্য রাখা দুস্কর হবে।

ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালি, এশীয় দেশের প্রবাসী এবং বেশ কয়েকজন সাদা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা প্রায় সবাই একমত যে, বরিস জনসন নিশ্চিতভাবেই জানেন ব্রেক্সিট নিয়ে তাকে একটা বিপজ্জনক যুদ্ধে নামতে হবে। ব্রিটেনের পত্রপত্রিকাও একমত যে- নতুন প্রধানমন্ত্রী বিলক্ষণ জানেন, যে যে কারণে তেরেসা মে ব্যর্থ হয়েছেন, সে সে কারণ সহজে দূর হওয়ার নয়। ফ্রান্স, জার্মানি বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যরা যে ব্রেক্সিট চুক্তিতে ছাড় দেবেন- ভাবার কারণ নেই। ব্রিটেন যেভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে, তা তাদের কাছে সম্মানজনক মনে হয়নি। বরং সেসব দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে ব্রেক্সিট একটি অপমানজনক পদক্ষেপ, যা উগ্র ব্রিটিশ জাতীয়তা।


এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন বরিস জনসন? আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে অথবা চুক্তি ছাড়াই বের হয়ে আসতে হবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। একদিক থেকে ভাবতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার পর এই প্রথমবার ব্রিটেন একটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। মন্দাকে কমবেশি পাশ কাটানো গেলেও ব্রেক্সিটের বিষ ব্রিটেনকে শেষ পর্যন্ত কতটা আহত করে, তা দেখার বিষয় বৈকি। দৃশ্যত তিনটি মূল কৌশল সামনে নিয়ে এগোচ্ছেন বরিস জনসন। প্রথমত, তিনি প্রধান প্রতিপক্ষ লেবার দলকে আগের চেয়েও দুর্বল করতে চান, যা করতে কমবেশি সফল হয়েছেন এরই মধ্যে। কারণ কনজারভেটিভ পার্টির এই চরম দুর্দিনেও জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি জনসমর্থন বাড়াতে পারেনি, যা দলীয় নেতৃত্বের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা; দ্বিতীয়ত, নিজ দলের দ্বিমত পোষণকারীদের জনসন দলে টানতে চান, যা করতে পর্দার অন্তরালে সবকিছুই করবেন তিনি; তৃতীয়ত, ব্রিটেনের শর্তে চুক্তি সম্পাদনের পক্ষে ব্রাসেলসের ইইউ সদর দপ্তরের ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন, অবশ্য তাতে কতটা সফল হবেন, তা দেখার বিষয়।

এরই মধ্যে ব্রেক্সিট যুদ্ধে জেতার লক্ষ্যে ২.১ বিলিয়ন পাউন্ডের অতিরিক্ত তহবিল ছেড়েছে সরকার, যা দিয়ে যুদ্ধ পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়া হবে। বলাই বাহুল্য, এই তহবিল ছাড়ের একমাত্র লক্ষ্য কোনো চুক্তি ছাড়াই যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে হয়, তাহলে পরিস্থিতি যেন মোকাবেলা করা যায়। এই তহবিলের মধ্যে ১.১ বিলিয়ন খরচ হবে 'ক্রিটিক্যাল অপারেশনে'; যার মধ্যে এমন কিছু অন্তর্ভুক্ত হবে, যা প্রকাশ্য নয়। এই তহবিলে আরও আছে ১০০ মিলিয়ন, যা প্রচার-প্রচারণা বা বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় হবে, যাতে মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি সামলাতে পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারেন।

মোট কথা, জেনেশুনেই যখন বরিস জনসন সেনাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন তাকে বৈতরণী পার হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। এই কঠিন যুদ্ধ জেতার আরেকটি কৌশলও ভাবা হচ্ছে- সেটি নতুন নির্বাচন। লেবার যখন দুর্বল, লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং অন্যরা যখন বিভক্ত বা দ্বিধান্বিত, তখন নতুন নির্বাচনে বরিস জনসন জিতবেন; দল আরও শক্তিশালী হবে- এমন ধারণা থেকেই নতুন ভোটের কথা ভাবা হচ্ছে। আরও ভাবা হচ্ছে, এতে হয়তোবা পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট ঐক্য আগের চেয়ে শক্তিশালী হবে, বৈতরণী হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

এগুলো সম্ভাবনার বিষয়, কী হবে বা হবে না, তা দেখার ব্যাপার। তবে ব্রেক্সিট কেন্দ্র করে ব্রিটেন যে অনিশ্চয়তার পথ বেছে নিয়েছে, সে পথ থেকে সরে আসতে হলে তাকে হয়তো উত্তরোত্তর উগ্রতার পথেই হাঁটতে হবে, যা হওয়ার হবে- এই নীতিতে, যা মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। স্মরণ করা যেতে পারে, চলমান নিশ্চয়তায় পাউন্ডের মূল্য এরই মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয়ের এক নিদর্শন।

আরও একটি বড় সংকট আছে। নর্দান আয়ারল্যান্ড বা ওয়েলস নিয়ে বড়সড় কোনো ঝামেলা না হলেও এরই মধ্যে বোঝা গেছে, স্কটল্যান্ড নিয়ে সংকট এড়ানো খুব একটা সহজ হবে না; যদি চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। সে কারণে প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের পরদিনই বরিস জনসন স্কটল্যান্ডের প্রথম মন্ত্রী (ফার্স্ট মিনিস্টার) নিকোলা স্টুরগেনের সঙ্গে দেখা করতে যান এডিনবরায়, যান স্কটল্যান্ডের মনোভাব বুঝতে কিংবা বলা যায়, স্কটিশদের পোষ মানাতে। কিন্তু লাভ কিছু হয়েছে বলা যাবে না। ব্রিটেনের অধিকাংশ পত্রিকার মতে, বরিস জনসনের স্কটল্যান্ড যাত্রা সফল হয়নি। সেখানে তিনি বিরুদ্ধবাদীদের বিক্ষোভের মধ্যে পড়েন এবং নিকোলা স্টুরগেন তাকে স্পষ্টই জানিয়ে দেন, যেহেতু দেশটির অধিকাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে মত জানিয়ে দিয়েছে, সেহেতু স্কটল্যান্ডের স্বার্থ রক্ষার্থেই চুক্তির বিকল্প নেই। কেবল এটিই নয়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে স্বাধীনতাপন্থি নিকোলা স্টুরগেন আরও বুঝিয়ে দিয়েছেন, যেভাবে বা যে প্রক্রিয়াতেই হোক ব্রিটেন যদি চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আবারও তিনি গণভোট করবেন। অতএব, পরিস্থিতি যে আরও ঘোলাটে হবে, তা স্পষ্ট।

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক