সৈয়দ শামসুল হককে বলা হয় সব্যসাচী লেখক। তার মানে লেখালেখির সব শাখায় তার সমান বিচরণ। কবিতা থেকে শুরু করে উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক- কোথায় নেই তিনিঙ্ঘ লেখক হিসেবে তিনি যেমন সব্যসাচী, একইভাবে সংস্কৃতিসেবী বা মননশীল মানুষ হিসেবেও তিনি সব্যসাচী। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবেও তার সব্যসাচী পরিচয় আমরা পেয়েছি। তিনি যেখানে মনোযোগ দিয়েছেন, সেখান থেকেই এসেছে সুখ্যাতি। তিনি সাংবাদিকতা করেছেন টেলিভিশনে, পত্রিকায়। বিনোদন সাংবাদিকতা করেছেন, বিবিসির বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিবিসিতে তার ভরাট কণ্ঠস্বরে প্রমিত বাংলা উচ্চারণ এ দেশের মানুষকে মুগ্ধ ও জাগ্রত করেছে। আমরা সৈয়দ হককে দেখেছি দারুণ এক আধুনিক মানুষ হিসেবে। পোশাক, চলাফেরায় তিনি বরাবরই ছিলেন মার্জিত ও কেতাদুরস্ত। সব সময় চেয়েছেন সময়ের নায়ক হয়ে থাকতে। আমাদের পূর্বসূরি ও অভিভাবকতুল্য এই মানুষটির কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার ছিল আমাদের। আমরা প্রতিনিয়ত তাকে দেখে অবাক হয়েছি। তার দুরন্ত তারুণ্যভরা চলাফেরা ও কাজকর্ম আমাদের মুগ্ধ করেছে। অনেক সময় সাহস জুগিয়েছে।
আমি সৈয়দ শামসুল হকের বহুমুখী প্রতিভার সব দিকে যেতে চাই না। আমার পক্ষে তার বৈচিত্র্যময় ও সুদীর্ঘ কর্মপ্রয়াসের মধ্যে প্রবেশ করাও সম্ভব নয়। আমি সবচেয়ে বেশি অনুরাগী তার গানের। গীতিকার সৈয়দ শামসুল হকের কাজ দেখে অভিভূত হয়ে যাই। আমি আগেও বিভিম্ন লেখা ও আলোচনায় বলেছি, বাল্যকাল থেকেই আমি সিনেমাপাগল মানুষ। ছোটবেলায় সিনেমা আমাকে খুব টানত। উর্দু সিনেমার যুগ পেরিয়ে যখন বাংলা চলচ্চিত্র পেলাম, তখন আমাদের কৈশোর ও তারুণ্য গঠনে সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আমরা হলে গিয়ে সিনেমা দেখে যেমন মুগ্ধ হতাম; সেই মুগ্ধতা আমাদের মাঝে থেকে যেত অনেক দিন। সিনেমার গানগুলো আমাদের পাগল করে রাখত। দৃশ্যপট যত মুগ্ধকর ছিল, তার চেয়ে বেশি প্রাণে লেগে থাকত গানের কথা, শব্দের গাঁথুনি আর ভাষার গভীরতা। গানগুলো আমাদের এক মায়াবী জগতে নিয়ে যেত। এই বয়সে এসেও আমি সেই গানগুলো ভুলতে পারি না। অবাক হয়ে ভাবি, একজন লেখকের কাজ ও চিন্তার পরিধি কত ব্যাপক হলে তিনি এত বেশি হূদয়গ্রাহী গান রচনা করতে পারেনঙ্ঘ আমি গানের সমঝদার শ্রোতা নই। সুর-তাল-লয় কিংবা রাগ-রাগিণী নিয়ে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে গান যে হূদয়ে গাঁথতে হলে তার ভাষার প্রাচুর্য লাগে; তা আমি বুঝেছি যেসব গীতিকারের গান শুনে, তাদেরই একজন সৈয়দ শামসুল হক। মনে পড়ে আমার সিনেমাপাগল কৈশোর-তারুণ্যে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র 'সুতরাং' ছবির গান 'তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে/ ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে/ তাই চম্পা-বকুল করে গন্ধে আকুল/ এই জোছনা রাতে মনে পড়ে।' কী অদ্ভুত গানের কথাঙ্ঘ পরের অন্তরায় 'চঞ্চল হাওয়া বয় কানে কানে কথা কয়/ বনে বনে চোখ হাসে দূরে কেন সরে রয়/ তুমিও তেমনি এমনও রাতে রবে কি দূরে দূরে।' এসব গানের কথা ষাটের দশকে আমাদের মুখে মুখে ফিরত।
আমি সৈয়দ শামসুল হককে 'হক চাচা' বলে ডাকতাম। তার লেখা গানের আমি যে মুগ্ধ ভক্ত একজন, সে বিষয়ে অনেকবারই আমার কথা হয়েছে। জেনেছি, সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এটি প্রথম গান। ১৯৬১ সালে ফরাশগঞ্জে একটি বাড়ির চিলেকোঠায় মেসে থাকতেন সত্য সাহা। সেই মেসে বসে গানটি দু'জনে মিলে তৈরি করেন। সৈয়দ হকের কথায় সুর যুক্ত করেছেন সত্য সাহা। সৈয়দ হক মূলত সত্য সাহাকে জনপ্রিয় করতেই গান লেখা শুরু করেন। গানটি 'সুতরাং' ছবিতে গেয়েছেন আঞ্জুমান আরা বেগম। শেষ মুখরাটুকু গেয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। শুধু এই গানটাই নয়; 'সুতরাং' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, সংলাপ, গান- সবই তিনি লিখেছেন সত্য সাহার সেই মেসবাড়িতে বসে। এই সুতরাং সিনেমার আরেকটি গান আমার ছোটবেলা থেকে মনে লেগে আছে। এই গানটির কথা এর আগেও আমি লিখেছি। 'এমন মজা হয় না/ গায়ে সোনার গয়না/ বুবুমণির বিয়ে হবে/ বাজবে কত বাজনা।' এই গান ছাড়া সে সময় যেন বিয়ের আসর জমত না। মাইকে গান বাজছে 'আজকে বুবুর মুখের হাসি/ কালকে বুবুর বিয়ে/ বর আসবে পালকি চড়ে/ বকুলতলা দিয়ে'- কী সুন্দর ছন্দময় কথাঙ্ঘ দারুণ এক আবহ। গানই যেন বিয়েবাড়িকে সাজিয়ে দেয়। আবার মনে পড়ে 'আয়না' চলচ্চিত্রে 'যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে/ সে কি তুমি নও, ওগো তুমি নও/ হূদয়ে আমার সুরের আবেশ/ ছড়িয়ে দিলে গো।' এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ফেরদৌসী রহমান। সুর করেছেন সত্য সাহা। এ গানের কথাগুলোও ভুলতে পারি না। কী দারুণ কথা- 'তুমি কিগো ছবি হয়ে থাকবে/ কখনও কি নাম ধরে ডাকবে/ তুমি মোর অন্তর, ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেন যাও না।' আমাদের সময়ের তরুণদের মধ্যে এই কথাগুলোই নাড়া দিত। ভালোবাসার এত সুন্দর অভিব্যক্তি- বিকল্প আর কী হতে পারে? অনেকেই সৈয়দ শামসুল হকের এত সুন্দর সুন্দর গানের কথা জানেন না। তিনি যে এত বড় গীতিকার ছিলেন, সে তথ্য কোথাও উঠে আসে না। আমাদের স্বর্ণালি যুগের চলচ্চিত্রগুলোর কথা তরুণ প্রজন্ম জানে না। কিন্তু সত্তর দশকেও যাদের জন্ম তারাও ভুলতে পারবে না এসব গান। 'বড় ভালো লোক ছিল' চলচ্চিত্রের গান এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস/ দম ফুরাইলে ঠুস/ তবু তো ভাই কারোরই নাই/ একটুখানি হুঁশ।' কী সুন্দর গানঙ্ঘ আলম খান সুর করেছিলেন এই গানটির। এ গানও বহুকাল তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরেছে। আমরা ভুলতে পারি না 'ময়না মতি' সিনেমার বিরহের একটি গান- 'অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়/ মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়/ আর তো আমায় ডাকবে না সে সকাল-দুপুর-সাঁঝে/ বলবে না আর মনের কথা মধুর মধুর লাজে/গাইবে না সে গান আমারই দূর আকাশের গায়/ মিছে তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পায়।' এই যুগে গানের এই লিরিক ছন্দোবদ্ধ বাক্যের এই গাঁথুনি, ভাষার এই প্রাচুর্য ও গভীরতা আর পাওয়া যায় না। গানের কথা শুনলেই মনের ভেতর ছবি আঁকা যায়। দর্শকদের যেন নিয়ে যায় অন্য এক নিসর্গে। বশীর আহমেদেরে কণ্ঠের গান। আমরা যখন সিমেনা দেখি তখন গানের গীতিকারের খোঁজও রাখি না। আমিও জানতাম না। পরে যখন জেনেছি, আমাদের 'হক চাচা' মানে সৈয়দ হক এই গানগুলোর স্রষ্টা, তখন তার প্রতি শুধু শ্রদ্ধাই বাড়েনি; মনে হয়েছে, একজন মানুষ কত বৈচিত্র্যময় কর্মজগৎ সৃষ্টি করেছেনঙ্ঘ
সত্যিই তিনি এক সার্থক লেখক, সার্থক সৃজনশীল ও সব্যসাচী। মনটা খারাপ লাগে অল্পদিনের মধ্যে আমরা অনেক গুণী মানুষ হারিয়ে ফেললাম। কিছুদিন আগে নায়করাজ রাজ্জাক চলে গেলেন। তার পরপরই চলে গেলেন বাংলা সঙ্গীতের কিংবদন্তি কণ্ঠস্বর আবদুল জব্বার। আরও কত গুণী মানুষকে হারিয়ে ফেলেছি গত কয়েক বছরে। এই তো সেদিন হক চাচা চলে গেলেন; এরই মধ্যে হয়ে গেছে একটি বছর। সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টিকর্মের অনেক কিছুরই খবর আমরা জানি না। যারা নিবিড়ভাবে সাহিত্য সাধনা ও গবেষণা করেন, তাদের কাছে হয়তো অনেক কিছুরই সন্ধান রয়েছে। কয়েক দিন আগে শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সেখানে তিনি বলেছেন, সৈয়দ শামসুল হক শেষদিকে তাকে চারটি গান দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু গানগুলোর সুর ও সঙ্গীত সম্পম্ন করার জন্য তেমন কাউকে পাচ্ছেন না। শুনেই মনে হলো, হয়তো এমনই হয়। সারাজীবন সৃষ্টিকর্মে নিমজ্জিত একজন মানুষ যখন চোখের আড়াল হয়ে যান, তখন তার কথা আর আমাদের মনে পড়ে না। তার সৃষ্টিকর্মের প্রতিও আমাদের সেই টান ও তাগিদ থাকে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সৈয়দ শামসুল হক তার বিপুল বিস্তৃত সাহিত্যকর্মের ভেতর যেমন বেঁচে থাকবেন, একইভাবে বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টি করা গানের ভেতর, যে গানগুলো সত্যিই জীবনের কথা বলে।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য করুন