কখন বিয়ে করব?

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

লামিসা মাহমুদ

'কালে কালে বেলা তো কম হলো না। এখনও বিয়ে করছ না কেন?'

ক্যারিয়ার গড়া শেষ। এখনও বিয়ে করছ না? চোখ কপালে তুলে জানতে চাওয়া।

বিয়ে হয়নি। কিংবা বিয়ে করেননি, এমন মানুষকে প্রায়ই এ কথার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এখনও বিয়ে করোনি! বিয়ের বয়স কি আর বসে থাকে? আসলে বিয়ের বয়স কত? এই জানতে চাওয়া অনেকের, বিশেষ করে যারা এখনও বিয়ে করেননি।

নিগার সুলতানা। দেশের একটি অন্যতম নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন সরকারি চাকরিতে ভালো পদে আছেন। সব সময় পড়াশোনা ও নিয়মকানুনের বেড়াজালে বন্দি থাকার পর এখন একটু নিজের মতো ঘুরেফিরে জীবনটা উপভোগ করতে চান। এখনই বিয়ের মতো কোনো রকম কমিটমেন্টে যেতে তিনি মোটেও আগ্রহী নন। তবে তার এই অনাগ্রহ নিয়ে মা-বাবার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা দিনমান চিন্তা করেন, মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেলে মেয়েকে কীভাবে পাত্রস্থ করবেন। বাড়িতে কোনো আত্মীয় এলেই তাকে ধরেন মেয়েকে বোঝাতে। পাড়া-প্রতিবেশী মেয়ের 'বিয়ে হচ্ছে না' কেন, এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে।

সামিরা আঞ্জুম। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। কর্মক্ষেত্রে সফল তিনি। কিন্তু পরিবার-সমাজের চোখে তিনি ব্যর্থ, কারণ তার 'বিয়ে হয় না'। বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে অথচ 'বিয়ে হয়নি' বলে তার পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। জীবনের ঘটনা হলো সেই- অনেক পাত্রকে তিনি পছন্দ করেননি, আবার তাকেও অনেকে অপছন্দ করেননি। অর্থাৎ ব্যাটে-বলে মেলেনি বলে এখনও সময় নিচ্ছেন। কিন্তু সবাই ধরে নিয়েছে যে সামিরার'বিয়ে হয় না'।

এই বিয়ের বয়স পার হওয়াদের দলে আরেকজন হলেন অনীক হাবীব। তিনি একজন চিকিৎসক, বয়স ৩৮। তাকেও আত্মীয়-বন্ধুরা প্রায়ই বিয়ে করতে তাগাদা দেন। 'কেন বিয়ে করছ না' জাতীয় প্রশ্নে তিনি জেরবার। কিন্তু পুরুষ হওয়ার কারণে বিয়ে হচ্ছে না, এর বদলে তাকে শুনতে হয় বিয়ে করছ না কেন?

এখানে ছেলেদের বিয়ে না হলে বলা হয় বিয়ে করছে না। আর মেয়েদের না হলে বলে বিয়ে হচ্ছে না। বিয়ের বয়স বিষয়টি ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হলেও মেয়েদের বেলায় ব্যাপারটা একটু বেশিই চাপের। কারণ, মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে গেলে সমাজ অবিবাহিত মেয়েটির কপালে 'বিয়ে হয় না' লেখা একটি অদৃশ্য মোহর এঁটে দেবে। যত বয়স বাড়বে, ততই তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকবে বলেই মনে করা হয়।

তবে কি বিয়ের বয়স, কেন বিয়ে হচ্ছে না- এসব কি মেয়েদের ক্ষেত্রেই হয়? একটা সময় ধর্মীয় রীতিতে নির্ধারণ করা হতো বিয়ের বয়স। সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ মনুসংহিতায় বিশেষত, মেয়েদের বিয়ের বয়সের ব্যাপারটায় বেশ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে মেয়েদের ঋতুবতী হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। ঋতুবর্তী হওয়ার পর মেয়ের বিয়ে না দিলে সেই মা-বাবাকে নরকে যেতে হবে। আবার সামাজিক ব্যাখ্যায় দেখা যায়, বাবার বাড়িতে মেয়েরা যদি বেশিদিন থাকে, তবে মা-বাবার রীতিতেই বেড়ে ওঠে কন্যাটি। তখন শ্বশুরবাড়ি তার জন্য কষ্টের হয়ে যায়। যেখানে সে সারাটি জীবন যাপন করবে। সে অনুযায়ী যেহেতু ধারণ করতে হবে জীবন, তাই বাবার বাড়ির রীতি থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শ্বশুরবাড়ির রীতিতে চলে আসাই ভালো।

পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন করে ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স ঠিক করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে বিয়ের বয়সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মেয়েদের বিয়ের বয়সটা একেবারে আঁটসাঁট করে ধরে-বেঁধে দেওয়ার চেষ্টায় থাকে সমাজ।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন জানান, বাংলাদেশে বিয়েতে মানবিক লেনদেনের বিষয়টি খুবই কম। এখানে বিয়েটা একটা বৈধ যৌনতার লাইসেন্স এবং মা হওয়ার উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সমাজ বিভিন্ন ধরনের মাপকাঠি দিয়ে ঠিক করে দেয় বিয়ের বয়স। এখানে বিয়েকে বংশবিস্তারের মাধ্যম বলে মনে করা হয়। তাই কমবয়সী নারীকেই বেছে নেওয়া হয়। যাতে করে সে মা হতে পারে। যদিও পুরুষ স্বাস্থ্য অন্যতম গুরুত্ব বহন করে, সেটি অবশ্য তেমন ধর্তব্যে আনা হয় না। এ ছাড়া আমাদের সমাজে সাধারণভাবেই একটি কথা চলে, সেটি হলো 'কুড়িতে বুড়ি'। অর্থাৎ প্রচলিত সামাজিক ধারণা হলো, মেয়েরা খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায়, মানে যৌন আবেদন হারিয়ে ফেলে। তাই মেয়েদের 'বিয়ের বয়স' খুব দ্রুত পার হয়ে যায়। কিন্তু যুগ বদলের ধারায় এখন মানুষের মনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নারী এখন স্বাবলম্বী হতে চায়। পড়াশোনা শেষ করে তাই সে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। এটা নারীর ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি তার জীবনটাকে আয়নায় কীভাবে দেখতে চান। কীভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করবেন, পুরো বিষয়টি একজন নারীর ব্যক্তিগত। একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়টিতে অনেক সময় নারী স্থির থাকতে পারেন না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে একটা চাপ তার থাকেই।

সামজিক এবং পারিবারিক চাপটি মেয়ের বাবা-মায়ের উপর পড়ে। একটা সময় বাবা-মায়ের সেই চাপ তাদের সন্তানের উপর পড়ে। এটা এমন হতে পারে তারা একজন অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া সন্তানের ওপর যেমন চাপ দিচ্ছেন, তেমনি হতে পারে পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে থাকা সন্তানটির ওপরেও। এটা আসলে একটা সামাজিক রীতিনির্ভর। এই রীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেটা আমাদের সামাজিক রীতি। আবার যোগ হবে পারিবারিক রীতিতেও। সমাজের অনেক পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব ব্যাক্তিজীবনে আমরা কম-ই দেখতে পারি। এই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে হবে আমাদের পরিবার কাঠামোতে। আমাদের ব্যক্তিজীবনেও এর প্রভাব থাকতে হবে। তখন নারীর জীবন কিংবা কারো ব্যক্তিগত জীবন আর যন্ত্রণাময় থাকবে না।