নিরাপদে কন্যাশিশু

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

ড. ফারাহ দীবা

নিরাপদে কন্যাশিশু

ড. ফারাহ দীবা, সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

'শিশু যৌন নির্যাতন'- এক সময় এই বিষয়টি শুনলেই যে কেউ আতঙ্কিত হয়ে উঠতেন। বলে কী! এমন ঘটনাও ঘটে? একজন সুস্থ-সবল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কেমন করে যৌন লালসা চরিতার্থ করতে একটি শিশুকে কষ্ট দিতে পারে? কিন্তু দিনে দিনে আমাদের সামনে এসব ঘটনা ঘটা যেন খুব স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এমন একটি দিন নেই, যেদিন পত্রিকা খুললে একটি যৌন নির্যাতনের  খবর পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (২০১৬) একটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালে শিশুদের ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬১ শতাংশ (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই, ২০১৬)। ২০১৪ সালে মোট শিশু ধর্ষণের ঘটনা জানা যায় ১৯৯টি আর ২০১৫ সালে মোট ৭২৭টি (প্রথম আলো, ১৯ মে, ২০১৬)। অর্থাৎ দৈনিক প্রায় দু'জন (অন্তত একজন) শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ক্রমে আমাদের আর শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটার খবর খুব বিচলিত করে না। বরং আমরা এখন ভয়ার্ত আর হতভম্ব। কখন আমাদের নিজেদের শিশুটির কী হয়? বারবার আমরা নিজের কাছে, অন্যের সঙ্গে প্রশ্ন করছি, কী হলো হঠাৎ? কেন এই ভাবনাতীত ঘটনার ব্যাপক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে?

ধারণা করি, হয়তো সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে অথবা এটা আসলে সংখ্যা বৃদ্ধি নয়। শিশু যৌন নির্যাতন আমাদের সমাজে সবসময় ছিল। কিন্তু তা ছিল নিঃশব্দে। আমাদের অজ্ঞাতে। অনেক দিনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্রমাগত সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে হয়তো এ সময়ে এসে শিশু যৌন নির্যাতনের রিপোর্টিং বেড়েছে। যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে লুকিয়ে রাখার চেয়ে বিচারের দাবি করার সাহস হয়তো কিছু হলেও বেড়েছে মানুষের। এমন ধারণা করার কারণ হলো, পেশাগত কারণে প্রতিদিন নানা রকম মানসিক সমস্যা নিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। বেশিরভাগ সমস্যার ব্যুৎপত্তি খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তার শৈশবে রয়েছে যৌন নির্যাতনের ইতিহাস। আজকে যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার জীবনে বিশ-ত্রিশ বা চল্লিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া নানা রকম দুঃখজনক ঘটনার মাঝে যৌন নির্যাতনের কথাও উল্লেখ করেন তখন তা নিশ্চিতভাবে বলে দেয়, শিশু যৌন নির্যাতন আমাদের সমাজের কোনো নতুন ঘটনা অবশ্যই নয়। তাই হয়তো যে সংখ্যক রিপোর্টিং এখন হচ্ছে, এরচেয়ে বেশি শিশু বাস্তবে নির্যাতিত হচ্ছে, কিন্তু রিপোর্ট হচ্ছে না। কারণ এখনও নিশ্চয় অনেক অভিভাবকই চাইবেন না তাদের শিশুর জীবনের এমন ঘটনা অন্যরা  জানুক, জনসমক্ষে আসুক।

অতএব সময় সত্যিই হয়েছে, এই সমাজে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকে প্রতিটি বর্তমান আর ভবিষ্যৎ শিশুকে রক্ষা করার। আমাদের জানা দরকার, কী কী অবস্থায় শিশুরা এহেন দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়, কীভাবে তারা এই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করে, কীভাবে শিশুদের নিরাপদে রাখা যায় ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (যেমন- ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স), গণমাধ্যম, পত্রিকা বাংলাদেশে এসব বিষয়ে তথ্য দিয়ে আসছে অনেক দিন। এখন আমরা মোটামুটিভাবে জ্ঞান রাখি, শিশু যৌন নির্যাতন কী, শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু হালের কিছু খবর আমাদেরকে নতুন করে দিশেহারা করে দিচ্ছে। আর তা হলো নির্যাতনকারী যখন আর কেউ নয়, শিশুর একান্ত আপনজন।

বিক্ষিপ্ত মনে বারবার প্রশ্ন জাগে, কেমন করে মানুষ একটি শিশুকে এমন নির্যাতন করতে পারে? আমরা হয়তো অনেকেই জানি, পেডোফেলিয়া (Pedophilia) একটি মানসিক যৌন সমস্যা, যার কারণে একজন ব্যক্তি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে একটি শিশুর (১৩ বছর বা তার কম) প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করে (DSM-5; APA, 2013)। তাদের ভেতর আবার এক দল আছে যারা বয়ঃসন্ধিকালে পুরোপুরি পৌঁছায়নি তেমন শিশুদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

আরেকটি দল হলো যেসব শিশু বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে গেছে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় (Ephebophile  ইফিবোফাইল)। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, সব পেডোফিলিক আবার যৌন নির্যাতনকারী হয় না বা সব যৌন নির্যাতনকারীই পেডোফিলিক নয়। সব ধরনের শিশু যৌন নির্যাতনকারীর ওপর করা নানা ধরনের গবেষণার সম্মিলিত ফলাফলে দেখা যায়, শিশুদের যারা যৌন নির্যাতন করে তাদের সবাই যে পেডোফিলয়ায় ভোগে, তা নয়। তাহলে কেন এত শিশু যৌন নির্যাতন ঘটে? তারা প্রধানত নিজের তাৎক্ষণিক যৌনক্ষুধা মেটাতে অন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অনুপস্থিতির কারণে ওই পরিস্থিতিতে উপস্থিত শিশুটিকে ব্যবহার করেছে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির ওপর প্রতিশোধ নিতে বা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের পন্থা বেছে নেয়।

সুস্থ নিরাপদ সমাজ তৈরির জন্য ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়া। শিশু-কিশোরদের জন্য ঘরের কোণে বসে বসে অসুস্থ মিডিয়া দেখার চেয়ে বাইরে নিরাপদ খেলাধুলার মাঝে সুস্থতার পথে বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা করা। যা নাগরিকদের তৈরি করা সম্ভব নয়, সম্ভব একমাত্র রাষ্ট্রের। আর একটি সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ তৈরির জন্য নাগরিকদের এই অধিকার অচিরেই নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই।