'ঘড়ির কাঁটায় জীবন' :আর কত!

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

লামিসা মাহমুদ

দৌড়ে চলেছে মানুষ। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে। ক্যালেন্ডারের দিনগুলোর সঙ্গে। দু-দণ্ড নিস্তারের জীবন কি মানুষ পায়? নাকি একটু ফুরসত নিজের জন্য? কেউ পায়, আবার কেউ পায় না। ক্রমশ দৌড়েই চলে তার জীবন।

সন্তানকে সকালে ঘুম থেকে ডেকে তোলা। স্কুলের জন্য তাকে সম্পূর্ণরূপে তৈরি করা। সেই সঙ্গে আছে নিত্য টিফিন দেওয়ার ঝক্কি। তাকে স্কুলে পৌঁছে টেবিলে নাশতা। পরিবারের সবার সারাদিনের খাবারের মেন্যু ঠিক করা। সকালের নাশতা শেষ হলে এরপর চিন্তা দুপুরের। পরিবারের কে কখন কোন খাবার খাবে, কে কোন পোশাক পরবে, সব দেখাশোনার দায়িত্ব পরিবারের কর্ত্রীর ওপর। পরিবারের শিশু এবং বৃদ্ধদের দেখাশোনার বিষয়টি তো আছেই। সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়া, তার পড়াশোনার তদারকি করা- সবকিছু রাখতে হয় নখদর্পণে।

এর সঙ্গে কর্মজীবী নারী হলে তো কথাই নেই। কিছু কাজ ঠিক করে রাখতে হয় আগের দিন রাতেই। কর্মজীবী নারীকে যেমন দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হয় কর্মক্ষেত্রে, তেমনি বাড়ির সবকিছুর খবরই তার রাখতে হয়। আর কর্মজীবী না হলেও গৃহিণী নারীরও ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ে চলতে হয়। এই যে সংসারের এতকিছু দেখভাল- সংসারের নিত্য ঝামেলায় নারী অজান্তে কখন স্ট্রেসের মুখোমুখি হন, তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না।

দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে মানসিক চাপমুক্ত থাকা যায়, জীবনকে কীভাবে সুন্দর করে যাপন করা যায় তা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না। খুঁটিনাটি সামলে প্রতিদিনের জীবনটা কীভাবে সুন্দর করে তোলা যায় তা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা। তিনি জানান-

আমরা নিজের জীবনকে শুধু ঘড়ির কাঁটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। অনেকে বুঝে উঠতে পারেন না তিনি আসলে কী চান, কী পেলে জীবনটা ঠিকঠাক চলে? সবকিছুর পেছনে না ছুটে সঠিক লাইফস্টাইল নির্বাচন করা জরুরি। যে লাইফস্টাইলে আমি সুস্থ থাকব। আমার পরিবার সুস্থ এবং সুন্দর থাকবে। সেটা আমরা ক'জন পালন করছি? এই যে আমাদের নাভিশ্বাস ছুটে চলা, এতে শুধু বাড়ছে আমাদের হতাশা। সেইসঙ্গে ডিপ্রেশনের আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। যদি আপনাকে বেশি কাজ করতে হয়, তবে নিজের জীবনযাত্রাকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। তাতে মন ও শরীর সুস্থ থাকবে। কোয়ালিটি টাইমটা ভালো কাজে ব্যয় করা যাবে।

মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা থেকে বাঁচতে হলে একসময় ব্যবস্থাপনা করতে হবে। মানসিক চাপের শিকার হলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়-
 
-খাওয়া-দাওয়া বেড়ে যায়। বেড়ে যায় ওজন।
 
-হরমোনে সমস্যা দেখা দেয়।
 
-খারাপ হয়ে যায় ত্বক। যেমন কালো ও শুস্ক হয়ে যায়, ব্রণ হয়। সোরিয়াসিস, রোসিয়া, একজিমা, ফেস ড্যামেজ হয়, অ্যালার্জি বেড়ে যায়। এ সময়ে ত্বক প্রাণহীন ও স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।

তীব্র মানসিক চাপে ভোগার জন্য অনেকে নানান অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হন। তবে সফল ব্যক্তিরা এ চাপ মোকাবেলা করেই কাজ করে যান এবং সফলতা ছিনিয়ে আনেন। মেনে নিতে পারেন কিছু পরামর্শ।

জীবন হোক সন্তুষ্টির : অসন্তুষ্টি থেকে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। তাই সফল ব্যক্তিরা এ থেকে দূরে থাকেন। তারা নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। এটি কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে রাখে। ফলে মানসিক চাপও কমে।

জীবনে 'যদি' না থাকুক : 'যদি বিষয়টা এমন হতো, তাহলে কেমন হতো...' ধরনের প্রশ্ন কোনো সমাধান আনে না। বাস্তবতাকে মেনে নিতে সমস্যা করে এমন প্রশ্ন। তাই এ ধরনের প্রশ্ন সফলরা এড়িয়ে চলেন।

ইতিবাচক ভাবনা সবসময় :ইতিবাচকতা মস্তিস্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানসিক চাপমুক্ত রাখে এবং সফল হতে সহায়তা করে। নেতিবাচক চিন্তাভাবনা থেকে তৈরি হতে পারে নেতিবাচক আত্মকথন। এতে মানসিক চাপ আগের তুলনায় আরও বেড়ে যেতে পারে। আর এ সমস্যা দূর করার জন্য সফল ব্যক্তিরা নেতিবাচক আত্মকথন বাদ দেন। কোনো  পর্যায়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে সফল ব্যক্তিরা 'বিচ্ছিন্নতা' তৈরি করেন। ফলে মানসিক চাপের অনেক বিষয় তাদের স্পর্শ করতে পারে না।

খুব বেশি চা-কফি? :চা কিংবা কফির মতো পানীয়তে থাকায় ক্যাফেইন মানসিক চাপ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এ পানীয় নিয়ন্ত্রণ করলে তা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করে। আর ঘুম মানসিক স্বস্তি দেয় এবং চিন্তাভাবনা পরিস্কার করে। পর্যাপ্ত ঘুমালে মানসিক চাপ কমার পাশাপাশি ঠাণ্ডা মাথায় বড় কোনো সমস্যার সমাধান করাও সহজ হয়।

মানসিক চাপের কারণ :কী কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে চিন্তাভাবনা করা অনেক সময় চাপ কমাতে সহায়তা করে। এ কাজটি সফল ব্যক্তিরা অহরহ করে থাকেন মানসিক চাপ উপশম করতে। সঠিক উপায়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে মানসিক চাপ কমানো যায়। এ অনুশীলন করে অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে সক্ষম হন। এ ছাড়া যে কোনো ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়া শুরু করলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, 'দুশ্চিন্তা কি আমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবে?' বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের উত্তর 'না'। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বড় করে শ্বাস নিলেই একটু ফুরফুরে লাগতে থাকবে!

একটু যদি নিয়ম করে চলেন, রুটিন মেনে চলেন, তাহলে স্ট্রেস আপনাকে অযথা হয়রানির মধ্যে ফেলতে পারবে না।

কিছু বিষয় মেনে চলতে পারেন। অফিসের কাজ অফিসেই করে, কাজের চিন্তাটুকু সেখানেই রেখে আসুন। কাজ যদি শেষ নাও হয়, বাসায় বসে দুশ্চিন্তা করে যেহেতু আমার কোনো উপকার হবে না, তাই সেটা নিয়ে না ভাবাই ভালো।

সময় দিতে হবে নিজেকে। বাসায় আয়েশ করে এক কাপ চা নিয়ে সবার সঙ্গে গল্প করতে থাকলেই স্ট্রেস কমে যাওয়া শুরু করবে, পরদিন চট করে বাকিটুকু শেষ করে ফেলুন। দৈনন্দিন কাজের মাঝে 'করতে ভালোবাসি' এমন সময়টা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। এই ভালোবাসার কাজগুলো দৈনন্দিন জীবনে আপনার রুটিনে একটা বড় অংশ হয়ে থাকবে। তখন দেখবেন কাজ করতে আর আলসেমি লাগবে না। মনের আনন্দে সব করবেন, সেই সঙ্গে মানসিক চাপ আপনাকে টা টা বলে বিদায় নেবে।

আসলে জীবন অনেকটা পথচলাতেই আনন্দের মতো। প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি ঘটনায় আপনি যদি ইতিবাচক কিছু দেখেন তাহলে দেখবেন স্ট্রেস কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে। যখন যে কাজ করবেন সেটা আনন্দের সঙ্গে করবেন। দেখবেন কোনোকিছুই মানসিক চাপে ফেলতে পারবে না আপনাকে।