নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতের সেরেস্তা থেকে ৯ বছর আগের একটি দেওয়ানি মামলার মূল কাগজপত্র, দলিলসহ একটি নথি গায়েব হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পরও মামলার নথি উদ্ধার ছাড়াই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় বিবাদীপক্ষ উৎফুল্ল হলেও বাদীপক্ষ অসন্তুষ্ট ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয়, বিবাদীপক্ষ একতরফাভাবে মামলার রায় নিজেদের পক্ষে নিতে আদালত পরিবর্তন করে বাদীপক্ষের অগোচরে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করে।

এদিকে, বাদীপক্ষ ন্যায়বিচারের জন্য আদালত থেকে গায়েব হওয়া মূল নথি খুঁজে বের করার জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডের পূর্বদিকে জেলা মার্কাজ মসজিদের পাশে ১১৫ শতাংশ জমি নিয়ে ২০০৯ সালে নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে মামলা (১৩৩/২০০৯) দায়ের করেন নূর হোসেন, হুমায়ূন আকবর আসাদ, অবাসসুম ও হালিমা নাজ। এ মামলায় বিবাদী শাহজামাল এবং ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার রেজা হিমেলসহ আরও কয়েকজন। মামলা চলাকালে ২০১২ সালের ৮ আগস্ট যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মঈনুল হকের সেরেস্তা থেকে মামলার মূল নথি গায়েব হয়ে যায়। এ কারণে বাদী উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন- এমন কথা জানালে মামলাটি পুনর্গঠন করে বাদীকে তার কাছে থাকা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র আদালতে আবারও দাখিল করার আদেশ দিলে বাদী আদালতে কাগজপত্র জমাও দেন। কিন্তু বাদী ২০০৯ সালে যখন মামলাটি করেন, তখন এই মামলা সংশ্নিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সংশ্নিষ্ট জায়গার মালিকানার কাগজ আদালত থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া মূল নথিতে সংযুক্ত ছিল। মামলা পুনর্গঠনে এসব কাগজ নতুন করে সংযুক্ত করা যায়নি।

আদালতে বিষয়টি জানালে আদালত জানান, নথি পাওয়া যাবে, আর পাওয়া গেলে তা মামলায় শামিল হবে। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি চলছিল। সেরেস্তা থেকে নথি গায়েব হয়ে গেলেও বিচারক

তার সেরেস্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি

বা বাদীপক্ষকেও এ বিষয়ে থানায় কোনো পদক্ষেপ নিতে দেননি।

এদিকে বাদীপক্ষকে না জানিয়েই হঠাৎ করে চলতি বছরের জুন মাসে মামলাটি জেলা ও দায়রা জজের অফিস বদলি মিসের আদেশে অর্থঋণ আদালতে গোপনে বদলি হয়। এ সময় একদিন হঠাৎ এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সুলতানা বেগম দেখতে পান অর্থঋণ আদালতে এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আদালতে এই মামলায় আপত্তি জানান এবং গোপনে নথি বদলি হওয়ার বিষয়টি অবগত নন বলেও আদালতকে জানান।

পরে আদালতকে জানানো হয়, মোকাদ্দমাটির মূল নথি অজ্ঞাত কারণে আদালতের সেরেস্তা থেকে হারিয়ে গেছে। সুতরাং যেই আদালত থেকে মামলাটি বদলি হয়েছে তা রহিত করে আগের আদালতেই মামলাটি বদলির আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা ও দায়রা জজ আনিসুর রহমান পরে আদেশ দেবেন বলে জানান। গত ৪ অক্টোবর কার্যতালিকায় বদলি মিস আবেদনটি মঞ্জুর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে অর্থঋণ আদালতে এই মামলাটির মিস আবেদনটি মঞ্জুর হয়েছে বলে জানানো হয়। কিন্তু বিবাদীপক্ষ এই বদলি মিসের আবেদনটি নামঞ্জুর হয়েছে বলে আপত্তি করে। এরই মধ্যে বাদীপক্ষ দেখতে পায়, আগের ৪ অক্টোবর বদলি মিসের কার্যতালিকায় যেখানে 'মঞ্জুর করা হলো' কথাটি লেখা ছিল, তার ওপরে ছোট করে লেখা হয়েছে 'সংশোধিত আকারে'। অন্যদিকে আদেশে দেখা যায়, এটি নামঞ্জুর হয়েছে। এ কারণে বাদীপক্ষের সন্দেহ হয় আদালতের আদেশ বের হওয়ার আগেই বিবাদীপক্ষ কী করে বলে দিতে পারে 'বদলি মিস' নামঞ্জুর হয়েছে। এ অবস্থায় বাদীপক্ষের মূল নথি, প্রমাণাদিসহ দলিল গায়েব করে দিয়ে সংশ্নিষ্ট আদালত থেকে ভুল বুঝিয়ে অন্য আদালতে গোপনে মামলাটি বদলি করে প্রভাবশালী বিবাদীপক্ষ তাদের পক্ষে রায় নেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে। এ ছাড়া রায় তাদের পক্ষে যাবে বলেও প্রচার চালাচ্ছে বিবাদীপক্ষ। এ অবস্থায় বাদী তার মূল কাগজপত্র যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালত থেকে খুঁজে বের করে সাক্ষী ও বিচারকাজ সম্পাদনের আবেদন করে। ইতোমধ্যে বাদীপক্ষ আদালতের সেরেস্তা থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া মূল নথি খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এই মোকাদ্দমার যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখতে আবেদন করেছে।

এ ব্যাপারে বাদীপক্ষের আইনজীবী সুলতানা বেগম বলেন, আদালতের সেরেস্তা নিরাপদ ভেবেই সবাই মামলার যাবতীয় কাগজপত্র সেখানে রাখেন। কিন্তু এভাবে নথি গায়েব বা হারিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনেও সেটি খুুঁজে না পাওয়া রহস্যজনক। আরও রহস্যজনক এ বিষয়ে আদালতের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া। উল্টো বাদীপক্ষকে না জানিয়েই মামলাটি অন্য আদালতে বদলি এবং সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়টিও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়, মামলা অন্য আদালতে যে পক্ষই বদলি করুক না কেন, তা প্রতিপক্ষের আইনজীবীকে জানানোর রেওয়াজ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাও করা হয়নি। এমনকি বিষয়টি বদলি হওয়া আদালতের পক্ষ থেকেও সমন দিয়ে আমাদের (বাদীপক্ষ) জানানো হয়নি। ফলে এ মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যথেষ্ট সন্দিহান। তাই আদালতের সেরেস্তা থেকে নথি গায়েবের বিষয়টি জানিয়ে ন্যায়বিচারের জন্য গায়েব হয়ে যাওয়া নথি খুঁজে বের করার জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান এ আইনজীবী।

বিবাদীপক্ষের আইনজীবী আবদুল মতিন বলেন, সেরেস্তা থেকে নথি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি একান্তই সেরেস্তার বিষয়। মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান। এখন সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। উভয়পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলেই আদালত রায় জানাবেন।

মন্তব্য করুন