কেউ বদলি হয়ে, কেউ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য চলে গেছেন। আছেন মাত্র একজন। চিকিৎসক অরুন্থিয়া সোমা সাহাই বর্তমানে বালিয়াকান্দি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। তার সঙ্গে প্রেষণে আসা দু'জনকে দিয়ে চলছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে এ দুরবস্থা।

চিকিৎসক সংকটের কারণে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে আসা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। প্রতিদিন বহির্বিভাগেই চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ৩০০ রোগী। চিকিৎসক স্বল্পতার পাশাপাশি অন্য সমস্যাগুলোও প্রকট আকার ধারণ করায় এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বালিয়াকান্দি উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। ২০১১ সালের ২৫ মার্চ হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। হাসপাতালটির জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা একজন, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা একজন, চিকিৎসা কর্মকর্তা দু'জন, কনসালট্যান্ট সার্জারি একজন, মেডিসিন একজন, গাইনি একজন, অ্যানেস্থেসিয়া একজন, ডেন্টাল সার্জন একজনসহ মোট ১৬ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে। কিন্তু কোনো সময়ই পদগুলো পূরণ থাকে না।

সম্প্রতি এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। মাসখানেক আগে হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন শাফিন জব্বার। তিনিসহ একসঙ্গে দু'জন চিকিৎসক বদলি হয়ে গেছেন। আরও দু'জন চিকিৎসক চলে যান উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য। এখন আছেন শুধু অরুন্থিয়া সোমা সাহা। তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে চিকিৎসক সুমন কুমার সাহা ও নিউটন শিকদারকে প্রেষণে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে এই তিনজনকে দিয়ে চলছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, প্রতিদিন শুধু বহির্বিভাগেই গড়ে ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। আন্তঃবিভাগে ভর্তি থাকেন ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী। দায়িত্বরত তিনজন চিকিৎসকের সঙ্গে পাঁচজন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে যখন রোগী দেখা হয়, তখন কোনো জরুরি রোগী এলে বন্ধ হয়ে যায় বহির্বিভাগে রোগী দেখাও।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যান্ত্রিক সমস্যা। হাসপাতালের ৪০ কেভির জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার হয়ে যায় পুরো হাসপাতাল। এক্স-রে মেশিনটি বন্ধ থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে অতিরিক্ত খরচ করে এক্স-রে করাতে হয়। সার্জারি চিকিৎসক না থাকায় বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। এ অবস্থায় গুরুতর কোনো রোগী এলে তাকে রেফার্ড না করে উপায় থাকে না বলে হাসপাতাল সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, মাঝে মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক পদায়ন করেন। তবে কেউ যোগদান করার কিছুদিনের মধ্যেই অন্যত্র চলে যান। আবার কেউ কেউ যোগদানই করেন না।

এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক অরুন্থিয়া সোমা সাহা বলেন, তিনিই একমাত্র পোস্টেড ডাক্তার। বাকি দু'জনকে প্রেষণে আনা হয়েছে। তারা তিনজন মিলে চালাচ্ছেন হাসপাতাল। তিনি নিজে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি জরুরি বিভাগে রোগী দেখছেন আবার রাউন্ডও দিচ্ছেন। আরএমওর দায়িত্বে থাকা সুমন কুমার সাহা তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জরুরি বিভাগে ও বহির্বিভাগে রোগী দেখছেন। নিউটন শিকদারও অনেক সহযোগিতা করেন। তাদের কোনো কিছু বন্ধ নেই। কাজ করতে করতে কেউ ক্লান্ত হয়ে গেলে তাকে বিশ্রাম দিয়ে আরেকজন করছেন। এভাবেই চলছে।

চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি রাজবাড়ী সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক অরুন্থিয়া সোমা সাহা।

রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. ইব্রাহীম হোসেন টিটন বলেন, বালিয়াকান্দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার পদটি শূন্য রয়েছে। সেখানে চিকিৎসক সংকটের কথা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দু'বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দ্রুতই পোস্টিং হবে। ৪২তম বিসিএস প্রক্রিয়াধীন। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে চিকিৎসক সংকট কেটে যাবে।

মন্তব্য করুন