প্রতিদিন সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে প্রত্যেক চিকিৎসকের কক্ষ ও এর বাইরে একাধিক নারী-পুরুষের তৎপরতা দেখা যায়। তাদের দেখে প্রথমেই মনে হবে, তারা হাসপাতালের কর্মচারী বা চিকিৎসকের সহকারী। তারা হাসপাতালের কর্মচারী নন, শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বেতনভুক্ত কর্মচারী। এসব দালালের কাজই হলো সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ফুসলিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে নেওয়া। তাই তারা দিন-রাত চষে বেড়ান মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, চিকিৎসকের চেম্বারসহ পুরুষ-নারী ওয়ার্ড ও বহিরাঙ্গনে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ও আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৫ থেকে ২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট ক্লিনিক। জেনারেল হাসপাতালের শয্যা সংকট ও চিকিৎসাসেবায় অব্যবস্থাপনার সুযোগে দালালদের প্ররোচনায় স্বজনরা রোগীদের নিয়ে যায় বেসরকারি ক্লিনিকে। চিকিৎসকরাও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পাঠাচ্ছেন বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। তাই রোগীরা বাধ্য হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ছুটে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের কিছু কমিশনলোভী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেই রোগীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। সাধারণ জ্বর বা পেটব্যথা নিয়ে কোনো রোগী গেলেও কয়েক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে দেন। এ ছাড়া হাসপাতালের অর্থপেডিক্স, সার্জারি এবং গাইনি চিকিৎসকরাও রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে নানা অপারেশন ও সিজার করাচ্ছেন। চিকিৎসায় কমিশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কমিশন, ওষুধে কমিশন ও অপারেশনের যাবতীয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও রয়েছে চিকিৎসকদের মোটা অঙ্কের কমিশন। তাই তারা রোগীদের পাঠিয়ে দেন তাদের নির্ধারিত বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজিক্যাল সেন্টারগুলোতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায় গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড প্যাথলজিক্যাল সেন্টারগুলোতে চলছে চিকিৎসার নামে কমিশন বাণিজ্য। জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও দালালদের কমিশন বাণিজ্যের কারণে জমজমাট হয়ে উঠেছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড প্যাথলজি ব্যবসা। সরকারি হাসপাতালে এবং চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসাসেবা নিতে গেলে রোগীদের প্রয়োজন ছাড়াই রক্ত, প্রস্রাব পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরেসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বলে দেওয়া হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানে এ পরীক্ষাগুলো করাতে হবে। অন্য প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও বকাঝকা করেন চিকিৎসকরা। তাই রোগীরা চিকিৎসকের নির্দেশিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সুযোগে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড প্যাথলজিক্যাল সেন্টারগুলোর মালিকপক্ষ রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। সেই টাকার একটি অংশ কমিশন হিসেবে রাখা হচ্ছে সেসব চিকিৎসক, নার্স ও দালালের জন্য, যারা রোগী পাঠাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বপ্ননীড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়োগ করা দালাল নুর হোসেন, স্বপন ও সাহিদা বেগম, নিউ স্কয়ারের শরীফ, কানন ও শ্যামল, বেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাত্তার মিয়া, প্রাইম ক্লিনিকের স্বপন ও জ্যোৎস্না বেগম, ফেমাস ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দোহা ও আসলাম এবং ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মীর, রকিব, মুন্নী আক্তার ও নাজমা বেগম বেতনভুক্ত দালাল হিসেবে নিয়মিত জেনারেল হাসপাতালে বিচরণ করছেন। এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া আরও একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল ঘুরছে হাসপাতালে।

জানা গেছে, বেতনভুক্ত দালাল ছাড়াও কমিশন বাণিজ্যের লোভে হাসপাতালের কিছু নার্স, ওয়ার্ড বয় ও কর্মচারীও বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগী পাঠানোর কাজে যুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্যেও অসহায় রোগীরা।

ফেমাস ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টারে নিযুক্ত কর্মচারী মোহাম্মদ দোহা জানান, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত কর্মচারী। চিকিৎসকের অধীনে থাকায় তার মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে যাওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দালালদের নিয়ন্ত্রণের জন্য হাসপাতালের অভ্যন্তরে ও বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে কয়েক দফা এসব দালালকে আটকের পর পুলিশে দেওয়া হয়। তবে এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পুরোপুরি দালালমুক্ত করা যায়নি। একেবারে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে।

বিষয় : দালাল চক্রে জিম্মি রোগীরা

মন্তব্য করুন