দেশের অন্যতম স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি বন্দর থেকে খাদ্যপণ্যের পরিবর্তে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অঘোষিত ফেব্রিকস পাঠানোর সময় দুটি ট্রাকসহ মালপত্র জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এই ট্রাক দুটিতে ঘোষণা দেওয়া তাল মিছরির সঙ্গে ঘোষণা না করা বিপুল পরিমাণ কাপড়, ওষুধসহ ফেব্রিকস উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগেও এই বন্দর দিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস। এই ঘটনা রাজস্ব ফাঁকির পাঁয়তারা।

যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে কাস্টমস। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানিকারকদের দাবিও তাই। যদিও ঘটনার পর থেকেই ট্রাকের চালক ও সংশ্নিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ কাউকে পাওয়া যায়নি।

গতকাল মঙ্গলবার প্রেস ব্রিফিংয়ে হাকিমপুর থানার ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, আটক ভারতীয় অবৈধ মালপত্রের মধ্যে রয়েছে দুই হাজার ২০৪ পিস শাড়ি, চার হাজার ৩৩ পিস ওড়না, এক হাজার ৮১২ পিস লুঙ্গি, ১৮৪ পিস থ্রিপিস, ১২২ পিস পাঞ্জাবি, এক হাজার ৮২৪ পিস ব্রা, ৫১ পিস শার্ট ও ১৮ পিস জিলেট পণ্য। এ ছাড়া ওষুধসহ বিভিন্ন ফেব্রিক্স পণ্য রয়েছে যেগুলোর হিসাব এখনও করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আমদানিকারককে আসামি করে মঙ্গলবার দুপুরে থানায় মামলা করা হয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

জানা যায়, গত রোববার বিকেলে হিলি স্থলবন্দরের সামনের সড়ক থেকে ট্রাক দুটি আটক করেন ইউএনও মোহাম্মদ নূর-এ আলম। এ সময় সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান ও আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশীদ, হাকিমপুর থানার ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ, এনএসআইর হিলি অফিসের সহকারী পরিচালক তজিমুল হক মানিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

কাগজপত্র যাচাই করে তারা দেখতে পান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হরিশংকরপুরের এসএস ইন্টারন্যাশনাল নামে রপ্তানিকারকের কাছ থেকে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের এসএন ট্রেডিং কোম্পানি নামের আমদানিকারক ৬৮০ বস্তায় ১৭ টন তাল মিছরি আমদানি করেন। এর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন হিলির সিপি রোডের জেস ইন্টারন্যাশনাল। যার শুল্ক্ক বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৮১ টাকা। তবে ট্রাক দুটিতে ১৭ টন তাল মিছরির পরিবর্তে অল্পকিছু তাল মিছরি পাওয়া গেছে। বাকি সব বিভিন্ন ধরনের ফেব্রিক্স রয়েছে। রোববার বিকেলে স্থানীয় সোনালী ব্যাংকে তাল মিছরির রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দরের ওয়্যারহাউস পানামা পোর্ট থেকে বাংলাদেশি দুটি ট্রাকের মাধ্যমে ভারতীয় কাপড়গুলো ঢাকায় পাচার করা হচ্ছিল। এ সময় ট্রাক দুটি আটক করা হয় এবং এরপর থেকেই সেগুলো খালাস করে পণ্য আলাদা করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, দুই সপ্তাহ আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশীদ বলেন, এভাবে পণ্য নিয়ে এলে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, তেমিনভাবে বন্দরের ও ব্যবসায়ীদের দুর্নাম হয়। এ ঘটনার সঙ্গে যদি কাস্টমস, বন্দর বা ব্যবসায়ী যে-ই জড়িত থাক, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তিনি বলেন, কাস্টমসের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই ঘোষণার বাইরে ভারত থেকে কোনো পণ্য আমদানি করা সম্ভব নয়। এভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য পাচার করে আনায় সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

হাকিমপুরের ইউএনও মোহাম্মদ নূর-এ আলম বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইর প্রাপ্ত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি কাগজপত্রে যে মালপত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে এটি ছাড়াও শুল্ক্ক প্রদান ব্যতীত কিছু অবৈধ মালপত্র ট্রাকে বহন করা হচ্ছে। এমন সংবাদে রোববার বিকেলে বন্দর থেকে বের হওয়ার পর সামনের সড়ক থেকে ঢাকা মেট্রো-ট ১৫-৪৭৬১ ও ঢাকা মেট্রো-ট ১৫-৫৯৭০ নাম্বারের দুটি ট্রাক আটক করা হয়। কাগজপত্র অনুযায়ী ট্রাক দুটিতে তাল মিছরি থাকার কথা থাকলেও তল্লাশি চালিয়ে সেখানে আমরা ভারতীয় বিভিন্ন কাপড়, ওষুধ ও ফেব্রিক্স উদ্ধার করি। যেগুলো অবৈধ ও শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে বিনা অনুমতিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ঢাকার একটি ঠিকানায়। ট্রাক দুটিকে আটক করে পুলিশের মাধ্যমে নিয়মিত মামলা করার কার্যক্রম চলছে। এর পাশাপাশি কাস্টমসের কারও এ বিষয়ে কোনো গাফিলতি আছে কিনা বা কেউ এর সঙ্গে জড়িত আছে কিনা তা দেখভাল করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই তাকে মামলার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে।

হিলি স্থলবন্দর শুল্ক্ক স্টেশনের উপকমিশনার সাইদুল আলম বলেন, ট্রাকের সব মালপত্র দেখা সম্ভব না। ১০ কিংবা ১৫ শতাংশ দেখা হয়। তবে ঘোষণার বাইরে অন্য মালপত্র নিয়ে আসার এই ঘটনায় রাজস্ব ফাঁকির যে পাঁয়তারা করা হচ্ছিল, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ আগেও এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন