১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাসদস্যদের গুলিতে পা হারানো পিন্টুর খোঁজ রাখেনি কেউ। ৪৪ বছর পরও সেই দুর্বিষহ স্মৃতি এবং পা হারানোর যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তার বাঁ পা চিকন হয়ে যাওয়ায় অনেকটা পঙ্গু হয়ে গেছেন পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামের মৃত এমএ হালিমের ছেলে রফিকুল ইসলাম পিন্টু। আর মৃত্যুর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান তিনি।

১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সমকালকে পিন্টু বলেন, আমি পড়াশোনা করার জন্য তখন বরিশাল শহরে বসবাস করতাম। গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে ১০ বন্ধু মিলে একটি ব্যান্ড দল গঠন করি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি এবং তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশালে একটি অনুষ্ঠানে আমাদের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তার ঢাকার বাসায় নিমন্ত্রণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৩ আগস্ট বরিশাল থেকে আমাদের ব্যান্ড দল সংগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ঢাকার ২৭ মিন্টো রোড়ের সরকারি বাসভবনে (বর্তমানে যা মিন্টো রোড ডিবি অফিস হিসেবে পরিচিত) যাই। ১৪ আগস্ট রাতে সংগীতানুষ্ঠান শেষে রাতের খাবার খেয়ে আমরা ১০ বন্ধু আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ওই বাসার ড্রইং রুমে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর অনুমানিক ৫টার দিকে হটাৎ গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। তখন সবাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। আমরা ভয়ে সোফার পেছনে আশ্রয় নেই।

ইতোমধ্যে মেজর শাহরিয়ার রশিদ, মেজর আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা এবং ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল অস্ত্র নিয়ে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় প্রবেশ করে। আমাদের চোখের সামনেই সেনাসদস্যদের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে শহিদ সেরনিয়াবাত এবং অন্যদের সঙ্গে তার স্ত্রীও জখম হন। তার পুত্র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ দরজার পেছনে লুকিয়ে থেকে বেঁচে যান। এ সময় ড্রইং রুম থেকে আমাদের বের করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। আমরা কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। আমাদের ১০ বন্ধুর একজন সেখানেই মারা যান। আমরা কয়েকজন কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হই। আরও কয়েকজন গুলিতে জখম হন। আমরা মৃতের মতো পড়ে থাকলে মারা গেছি ভেবে চলে যায় সেনাসদস্যরা। পরে পুলিশ এসে গুলিবিদ্ধ আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। যার মধ্যে আমিও ছিলাম। সেখানে ২৮ দিন চিকিৎসা দেওয়া হয় আমাদের। তার পর থেকে আমার বাঁ পা আস্তে আস্তে চিকন হয়ে অনেকটা পঙ্গু অবস্থায় চলাফেরা করতে হচ্ছে।

এ ঘটনার ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আমি পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছি। ওই রাতে আহত হওয়ার স্বীকৃতি আজও পাইনি আমি।

মন্তব্য করুন