ঘাটাইলে ৮ মাসে ৫০৬ বাল্যবিয়ে

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মো. মাসুম মিয়া, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)

অনেক স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে বড় কিছু হবো। বিয়ের মধ্য দিয়ে আমার স্বপ্নের কবর রচনা হয়েছে। কথাগুলো বলার সময় গলা ধরে আসছিল ঘাটাইলের নবম শ্রেণির ছাত্রী মীমের। ক্লাসে বিজ্ঞান শাখায় দুই রোল ছিল তার। অল্প কিছু দিন হলো তার বিয়ে হয়েছে। স্বামী প্রবাসী। যে বয়সে ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন বোনার কথা সেই বয়সে মীমের মতো ঘাটাইলের অনেক কিশোরীকে স্বামী-সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় বাল্যবিয়ে। চলতি বছরের ৮ মাসে উপজেলায় ৫০৬ জন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। যাদের সবার বয়স ১২-১৪ বছরের মধ্যে। উপজেলায় ৬১টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৩২টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান চালিয়ে ৫০৬টি বাল্যবিয়ের এ হিসাব পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, এ বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৭ জন, সপ্তম শ্রেণিতে ৬১ জন, অষ্টম শ্রেণিতে ১১৭ জন, নবম শ্রেণিতে ১৪১ জন ও দশম শ্রেণিতে ১৬০ জন। অর্থাৎ ৮ মাসে মোট ৫০৬ জন শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৬৪ জনের বিয়ে হয়েছে। অথচ গত মাসিক সমন্বয় সভা ও আইন-শৃঙ্খলা সভায় উপজেলায় বাল্যবিয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি করে অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন। ইউএনও অফিস সূত্রে জানা যায়, এই সময়ের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময় বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে মাত্র ১২টি। ২০১৬ সালে এ উপজেলাকে বাল্যবিয়ে মুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হলেও তা রয়েছে শুধু কাগজ-কলমে। অধিকাংশ স্কুল ও মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে যে পরিমাণ ছাত্রী ভর্তি হয় দশম শ্রেণি পর্যন্ত যেতে যেতে তাদের অর্ধেকের বেশিই ঝরে পড়ে শুধু বাল্যবিয়ের কারণে।

উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। পৌরসভা ও প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে আট মাসে বাল্যবিয়ে সংগঠিত হয়েছে ঘাটাইল পৌরসভায় ১৬টি, দেওলাবাড়ি ইউপিতে ৬০, ঘাটাইল সদর ইউপিতে ২, জামুরিয়া ইউপিতে ৪৫, আনেহলা ইউপিতে ২৬, লোকেরপাড়া ইউপিতে  ১৪, দীঘলকান্দি ইউপিতে ৩৩, দিগড় ইউপিতে ৩৭, দেওপাড়া ইউপিতে ২৯, ধলাপাড়া ইউপিতে ৪২, সাগরদীঘি ইউপিতে ৫১, লক্ষীন্দর ইউপিতে ৪২, রসুলপুর ইউপিতে ৪৭, সন্ধানপুর ইউপিতে ২৬ ও সংগ্রামপুর ইউপিতে ৩৬টি।

উপজেলা প্রসাশন সূত্রে আরও জানা যায়, আট মাসে বাল্যবিয়ে বন্ধ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আলোচনা হয়েছে ২৪ বার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করা হয়েছে মা ও অভিভাবক সমাবেশ। তারপরও থামছে না বাল্যবিয়ে। নিকাহ রেজিস্ট্রেশনে সরকারের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কাজিদের যে বিধি-নিষেধ বা আইন রয়েছে তার বিন্দুমাত্র মানতে দেখা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক জানান, মেধাবী ও দেখতে সুন্দরী এমন মেয়েগুলোই বেশি বাল্যবিয়ের বলি হচ্ছে। অভিভাবকরা গোপনে এ কাজ সেরে ফেলেন। অনেক অভিভাবক নিজ বাড়িতে বিয়ের কাজ না করে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। যা আমরা জানতে পারি প্রায় সপ্তাহখানেক পর।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, যেসব শিশু শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে তাদের বড় একটা অংশের স্বামী প্রবাসী। প্রবাস থেকে দু'তিন মাসের ছুটি নিয়ে এসে বিয়ে করে আবার চলে যায় প্রবাসে। ফলে পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ায় জড়িয়ে ভেঙে যাচ্ছে অনেকের সংসার। অনেকেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে মাসের পর মাস থেকে যাচ্ছে বাবারবাড়িতে।

এ বিষয়ে লেখক ও গবেষক জুলফিকার হায়দার বলেন, আমাদের সমাজ এখনও সেই ঊনবিংশ শতকেই পড়ে আছে। তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মানুষ এখনও বের হয়ে আসতে পারেনি। যে কারণে বাল্যবিয়ে কমছে না। সাগরদীঘি ইউপি চেয়ারম্যান হেকমত শিকদার বলেন, বেশিরভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় প্রবাসী ছেলের কাছে। অভিভাবকরা নিজ বাড়িতে বিয়ের কাজ না করে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেন।

ধলাপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান এজহারুল ইসলাম বলেন, বাল্যবিয়ের কুফল বলেও রোধ করা যাচ্ছে না। অভিভাবকরা আমাদের কথা শুনতে চান না।

উপজেলা কাজি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, আমরা কোনো বাল্যবিয়ের নিকাহ রেজিস্ট্রেশন করি না। জন্মনিবন্ধন দেখে তারপর নিকাহ রেজিস্ট্রেশন করি। এ বিষয়ে ইউএনও মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত বাল্যবিয়ে বন্ধে বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে যাচ্ছি। এটি বন্ধ করতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।