রাজধানী ঢাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থান ও বিনোদন কেন্দ্র হাতিরঝিল। ঝিলপাড়ের সারিবদ্ধ গাছ আর সুন্দর মসৃণ একমুখী সড়ক এর সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। এ কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘুরতে আসে মানুষ। তবে হাতিরঝিল কখনও কখনও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে হতাহত হয় মানুষ।

সুন্দর এই সড়কে কেন প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে- এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেছে ছয়টি কারণ। এক. ফাঁকা সড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো। দুই. সড়কের বাঁকেও গাড়ির গতি না কমানো। তিন. রাতে গাড়ি ও মোটরসাইকেল রেস। চার. উল্টোপথে গাড়ি চালানো। পাঁচ. রাতের আলো-আঁধারে সড়কে গাড়ি পার্কিং। ছয়. ছিনতাই চক্র।

প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও গত বছরে হাতিরঝিল থানায় এ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে মাত্র চারটি। এ ছাড়া চলতি বছরে সাংবাদিক হাবীব রহমান নিহতের ঘটনা জানিয়েছে পুলিশ। সাংবাদিক হাবীব গত মঙ্গলবার রাতে সিদ্দিক মাস্টার ঢাল সংলগ্ন হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে মীরবাগের বাসায় ফিরছিলেন। এর আগে গত বছরের তিন এপ্রিল মধুবাগের আমবাগান সংলগ্ন হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝিলিক আলম নামের একজন নিহত হন। একই বছরের ২২ মার্চ সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল সংলগ্ন সড়কে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় একজন আহত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দু'দিন পর তিনি হাসপাতালে প্রাণ হারান।

দুর্ঘটনায় মৃত্যু কিংবা গুরুতর আহত না হলে সাধারণত কেউ থানায় অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য থানা থেকে পাওয়া যায়নি। ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক ক্ষেত্রে দু'পক্ষ মীমাংসা করে ফেলে। এ ছাড়া যেসব ঘটনায় গাড়ি নিয়ে চালক পালিয়ে যান এবং দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি সামান্য আহত হন সেসব ঘটনাও পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় না।

হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ে হাতিরঝিলের আশপাশের বাসিন্দা, ভাসমান হকার, সড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন দোকানি, পুলিশ এবং হাতিরঝিল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলছেন, হাতিরঝিলে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও একমুখী সড়কে উল্টোপথে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণে নেই তেমন ট্রাফিক ব্যবস্থা। প্রায়ই রাত ১২টার পর হাতিরঝিলে চলে মোটরসাইকেল ও কার প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া হাতিরঝিলে আরেকটি বড় সমস্যা অবৈধভাবে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল। যাত্রী তুলতে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করে এসব গাড়ি। অদৃশ্য কারণে ট্রাফিক পুলিশ এসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। হাতিরঝিলের ব্রিজ ও সড়কে গাড়ি চলাচলের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাফিক পুলিশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলেও তারা মনে করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক, উত্তর) আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ সমকালকে বলেন, হাতিরঝিল সড়ক ফাঁকা পাওয়ায় চালকরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। অসতর্কতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ ও উল্টোপথে গাড়ি চলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জানা যায়, হাতিরঝিলের তিনটি স্থান ছিনতাই স্পট হিসেবে চিহ্নিত। সেগুলো হলো- হাতিরঝিলের বেগুনবাড়ি অংশ, পাগলা মাজার থেকে মধুবাগ ব্রিজের ঢাল পর্যন্ত এবং মেরুল বাড্ডা অংশে গ্রিনপার্কের পাশের সড়ক। সাধারণত রাত ১টার পর এসব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাই কাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়। মোটরসাইকেল চালকদের দু'পাশ থেকে দুটি মোটরসাইকেল চাপিয়ে ছিনতাই করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক আতঙ্কে গাড়ির গতি বাড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাতিরঝিলে গাড়ির গতিসীমা ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে। বিভিন্ন স্থানে গতিসীমা সংক্রান্ত সাইনবোর্ড রয়েছে; কিন্তু গাড়িচালকরা তা মানেন না। বেশ কয়েক স্থান আঁকাবাঁকা আছে, সেখানেও গাড়ির গতিসীমা না মেনে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিজে বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের গতি থাকে ৮০-৯০ কিলোমিটার। অন্য যানবাহনের গতিও বেশি।

গত বুধবার রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা হয়। ১১টা ২০ মিনিটে ছয়টি দ্রুত গতির মোটরসাইকেল মহানগর প্রজেক্ট সংলগ্ন সংযোগ ব্রিজে থামে। প্রতিটি মোটরসাইকেলে দু'জন তরুণ ছিলেন। তারা ব্রিজে মোটরসাইকেল রেখে আড্ডায় মশগুল। রাস্তার ওপর মোটরসাইকেল থাকায় অন্য যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটলেও তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। সাড়ে ১১টায় মধুবাগ দিক থেকে একটি প্রাইভেটকারকে উল্টোপথে এসে মহানগর প্রজেক্ট সংলগ্ন ওই সংযোগ ব্রিজ পার হয়ে গুলশানের দিকে যেতে দেখা যায়। প্রায় ২৫ মিনিট পর মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান তরুণরা। গাড়ির পিকআপ বাড়িয়ে বিকট শব্দ করেন তারা। এর আগে রাত পৌনে ১২টায় বেগুনবাড়ি অংশ থেকে ঝিলসংলগ্ন সড়কে পাশাপাশি দুটি প্রাইভেটকার পার্কিং করা দেখা যায়। গাড়ির যাত্রীরা ঝিলের পাশে সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছেলেন। গাড়ি দুটি যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে আলো নেই সেভাবে। দ্রুত গতির কোনো গাড়ি আলো-আঁধারিতে পার্কিং করা ওই দুটি গাড়ির পেছনে অসাবধানতাবশত ধাক্কা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে চার তরুণ ও দুই তরুণীর মধ্যে এক তরুণ নাম প্রকাশ না করে বলেন, 'ভাই কিছুক্ষণ আগে রাখলাম। রাতের ঠান্ডায় হাতিরঝিল দেখতে আসলাম।' এর আগে রাত ১১টা ৫ মিনিটে হাতিরঝিলের রামপুরা অংশের সংযোগ ব্রিজে দুটি প্রাইভেটকার ও একটি জিপ গাড়ি পার্কিং করা দেখা যায়।

বুধবার রাতে হাতিরঝিলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সুপারভাইজার রেজাউল করিম জানান, রাতে গাড়ির গতি অনেক বেশি থাকে। চালকরা পিকআপ বাড়িয়ে উচ্চ শব্দও সৃষ্টি করে। রাত ১২টা-১টার পর গাড়ির রেস হয়। সাধারণত মোটরসাইকেল রেসে গ্রুপ ধরে আসেন তরুণরা। তবে শীতের কারণে এখন কম দেখা যায়।

আরেকজন নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গভীর রাতে অনেক সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে তাদের কাছে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। কিন্তু পরে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে খুঁজে পান না। এ ছাড়া ছিনতাইকারীদের ধাওয়ায় পালিয়ে আসা অনেকেও তাদের কাছে অভিযোগ করেন।





মন্তব্য করুন