মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরের মহাব্রহ্মাণ্ড মর্ত্যবাসীর কাছে অজানা এক রহস্যপুরী। জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কিছু তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে এলেও হাজারো প্রশ্নের ওপর থেকে সরেনি পর্দা। তবে অদম্য প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ছায়াপথের অজানার খোঁজে নাসা পাঠাচ্ছে এ যাবৎ তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী 'জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ'।

গভীরভাবে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য নাসা হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পাঠিয়েছিল ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল। এটি বসানো আছে ভূপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে পাঁচশ কিলোমিটার উঁচুতে। এই টেলিস্কোপের কল্যাণে গত তিন দশকে মহাকাশবিজ্ঞান খুব দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। শুরুতে সমস্যা হলেও পরবর্তী সময়ে হাবল প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া দেওয়ায় মহাকাশ নিয়ে গবেষণা আরও এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মাণ্ডের আরও গভীরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থার বিজ্ঞানীদের দাবি, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশ গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

নাসা জানিয়েছে, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করার এই নতুন চোখ প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ম্ফোরণের পর থেকে এখনকার সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু, তাদের উৎপত্তি, বিকাশ ও ধ্বংসের বহু ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এটি ব্রহ্মাণ্ডের অনেক অজানা তথ্য বিজ্ঞানীদের জানাতে পারবে।

এই টেলিস্কোপ সৌরমণ্ডলের জন্মের দিনগুলোর কথা, ভিন্ন গ্রহে প্রাণের পক্ষে টিকে থাকার পরিবেশ রয়েছে কিনা, থাকলেও তা কতটা সহায়ক- এসব জানা যাবে। এমনকি বিগ ব্যাংয়ের দীর্ঘ সময় পর প্রথম প্রজন্মের ছায়াপথগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই ইতিহাসও জানার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের কাছে প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে জেমস ওয়েব।

নাসা জানিয়েছে, মহাকাশে যে জায়গায় এই অবলোহিত রশ্মির টেলিস্কোপটিকে বসানো হবে, সেই জায়গা পৃথিবী থেকে ১০ লাখ মাইল বা ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে। উৎক্ষেপণের পর সবকিছু ঠিকঠাক চললে সেই পথ পাড়ি দিতে এক মাস লাগবে। সেখানে পৌঁছে তার আয়নাগুলো ও সানশিল্ড খুলতে এবং অন্যান্য যন্ত্র চালু করতে লাগবে আরও অন্তত ছয় মাস।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী অন্তত এক দশক এই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপই হবে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, এসা, সিএসএ, ইসরো, জাপানের জাক্সা ও রাশিয়ার রসকসমসের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার প্রধান অবলম্বন।

সর্বশেষ সূচি অনুযায়ী, অত্যন্ত শক্তিশালী 'আরিয়েন ৫ ইসিএ' রকেটে চেপে এটি মহাকাশে পাড়ি জমাবে আগামী ২২ ডিসেম্বর। রকেট উৎক্ষেপণ হবে দক্ষিণ আমেরিকার ফরাসি গায়ানা থেকে। নানা জটিলতায় এর আগে কয়েক দফা এই সূচি পরিবর্তন করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর করার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে রকেটটির একেবারে ওপরের স্তরে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। টেলিস্কোপটি তৈরিতে নাসার সঙ্গে রয়েছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (এসা), কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (সিএসএ) এবং রকেটটি বানিয়েছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি।

জেমস ওয়েবের শক্তি: গবেষণার জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে তৈরি করা এই টেলিস্কোপে রয়েছে মূলত ছয়টি যন্ত্র। নিয়ার-ইনফ্রারেড ক্যামেরা (নিরক্যাম), নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ (নিরস্পেক), মিড-ইনফ্রারেড ইন্সট্রুমেন্ট (মিরি), নিয়ার-ইনফ্রারেড ইমেজার (নিনফি), স্লিটলেস স্পেকট্রোগ্রাফ (নিরিস) এবং ফাইন গাইডেন্স সেন্সর (এফজিএস)।

এখন পর্যন্ত বানানো জটিলতম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। অন্যতম ব্যয়বহুলও বটে। ইনফ্রারেড আলো দিয়ে কাজ করবে জেমস ওয়েব, হাবল প্রধানত কাজ করে 'ভিজিবল লাইট স্পেকট্রামে।

হাইডেলবার্গের মাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ তৈরির সঙ্গে জড়িত। ইনফ্রারেড আলো দিয়ে কাজ করার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ আছে বলে মনে করেন অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ক্লাউস ইয়েগার। তিনি বলেন, তারা গঠিত হওয়ার জায়গা, ধূলিকণায় ঢেকে যাওয়া আলো প্রভৃতি পরিস্থিতি দেখতে ইনফ্রারেড আলোর প্রয়োজন। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় হওয়ায় ইনফ্রারেড ক্লাউডের মধ্যে ঢুকতে পারে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, মহাবিশ্বের আকার বাড়ছে, অনেক দূরের ছায়াপথের আলোর রং লালের দিকে ঝুঁকছে, যা ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা যাবে। ইনফ্রারেড দিয়ে কাজ করবে বলে জেমস ওয়েব ঠান্ডা রাখতে বিশেষ নকশা অনুসরণ করা হয়।

একটি টেনিস কোর্টের সমান সানশেড দিয়ে তাপরশ্মি দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে একটা রকেটে এত বড় শেড ধরবে না বলে এমন এক জটিল অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা শুধু মহাকাশে খুলবে। আর হাবলকে কয়েক দফা মেরামত করা গেলেও জেমস ওয়েবের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এটি আর মেরামতের সুযোগ থাকবে না। হাবলে একটা আয়না আছে। জেমস ওয়েবে থাকবে ১৮টি, ভালো ছবি তুলতে সক্ষম করার জন্য যেখানে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো মহাকাশে একটি আরেকটির সঙ্গে জোড়া লাগবে। তখন এর আকার হাবলের আয়নার তিন গুণ হবে। বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ৫০০ মিলিয়ন বছর-পরবর্তী মহাবিশ্বের আলোও ধরতে পেরেছে হাবল। আশা করা হচ্ছে, হাবলের উত্তরসূরি হিসেবে জেমস ওয়েব আরও আগেকার আলো ধরতে পারবে।

ইংল্যান্ডের ডুরহ্যাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্টিন ওয়ার্ড বলেছেন, একটি টেলিস্কোপ মূলত একটি টাইম মেশিন। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাঠানো হয় এবং সে সময় পর্যন্ত সেটি সেবা দিয়ে থাকে।

রুয়র ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট রালফ-ইয়ুর্গেন ডেটমার বলেছেন, হাবলের উত্তরসূরিই হচ্ছে ভবিষ্যৎ। আরও বেশি বিজ্ঞানচর্চার জন্য এটি দরকার। হাবলকে দিয়ে আমরা যা করার চিন্তা করেছিলাম, তার প্রায় সবই আমরা করেছি।

যুক্তরাজ্যের মহাকাশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক জিলিয়ান রাইট বলেন, মহাকাশে এর আগে এত বড় কোনো কিছুর সুবিধা আমরা পাইনি। একটি টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের একেকটি জানালা খুলে দেয়। জেমস ওয়েবের ক্ষেত্রে এটিই সত্য। সূত্র :দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, ডিসকভারি নিউজ, সায়েন্স ফোকাস ও ডয়েচে ভেলে।

মন্তব্য করুন