কানাডার টরন্টোতে স্কারবোরো শহরের হেয়ারউড সড়কের ৭৩ নম্বর বাড়ির মালিক নাটোরের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের স্ত্রী শামীমা সুলতানা জান্নাতী। গত বছরের জানুয়ারিতে বাড়িটি কিনতে তিনি খরচ করেন ১৭ লাখ ২৬ হাজার কানাডিয়ান ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ কোটি টাকা। শামীমা সুলতানা জান্নাতী একজন গৃহিণী। এমপি শিমুল পাচারের টাকায় স্ত্রীর নামে এই বাড়ি কিনেছেন।

সোনালী ব্যাংকের আলোচিত ঋণখেলাপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান রতন পাচারের টাকায় কানাডায় তিনটি বাড়ি কিনেছেন। ৪৭ লাখ কানাডিয়ান ডলার খরচ করে ২০১৭ সালে টরন্টোতে এসব বাড়ি কেনেন তিনি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্যমান দাঁড়ায় ২৮ কোটি টাকা। এমপি শিমুল ও রতনের কানাডায় বাড়ির তথ্য দেশটির সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটেই রয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশ হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অথচ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল রোববার জাতীয় সংসদে বলেন, কারা বিদেশে টাকা পাচার করেন, তা তিনি জানেন না। বিরোধী দলের সদস্যদের কাছে তিনি পাচারকারীদের তালিকা চান। বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে অভিযোগ আনা হলে এমন বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী। এর আগেও তিনি সংসদে একই ধরনের বক্তব্য দেন। অর্থমন্ত্রী খুঁজে না পেলেও সন্দেহভাজন অর্থ পাচারকারীদের তালিকার অভাব নেই। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অর্থ ও মানব পাচারের দায়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের চার বছরের কারাদণ্ড দেন কুয়েতের আদালত। দণ্ডের পাশাপাশি তাকে ৫২ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়। এরপর বাংলাদেশেও সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে পাচারকারীদের বিষয়ে তথ্য না পাওয়ার কথা বললেও গত বছর অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন আলোচনার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছিলেন, কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কিনেছেন এমন একটা তালিকা তার কাছে রয়েছে। যদিও তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি। পরবর্তীতেও এ নিয়ে কোনো কথাও আর বলেননি।

দেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার হাতে রয়েছে। আবার সন্দেহভাজনদের তালিকা ধরে বিভিন্ন দেশের ওয়েবসাইট থেকেও পাচারকারীদের তথ্য বের করা সম্ভব। কেননা বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে বিনিয়োগ করার একমাত্র বৈধ উপায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন। অনুমোদন ছাড়া কেউ বাইরে বিনিয়োগ করলে তা অবৈধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। কারও বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগ উঠলে দ্রুত প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাংকসহ অন্যদের অন্তত সতর্ক করতে হবে। পাচারের অর্থ উদ্ধার সময়সাপেক্ষ বিধায় বসে থাকলে হবে না। বিআইএফইউ, দুদক ও সিআইডির মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বারবার ফলোআপ করতে হবে।

বাংলাদেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অর্থ পাচার প্রমাণ করার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে এ ধরনের তথ্য অনুসন্ধান না করতে বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান না করে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের উন্নত অনেক দেশ বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অনেক সময় পাচারের তথ্য দিতে চায় না। এসব কারণে অর্থ পাচারের তথ্য উদ্ঘাটন জটিল হয়ে যায়।

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাচারকারীদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ হচ্ছে। তবে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা অর্থ উদ্ধার হয়েছে সামান্য। এ পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর ২১ কোটি টাকা এবং আরেক ছেলে তারেক রহমানের বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের পাচার করা প্রায় ২১ কোটি টাকা দেশে ফেরত এসেছে। এর বাইরে কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে এমন অভিযোগে কয়েকজনের অর্থ ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোট আইসিআইজে যেসব অনুসন্ধান প্রকাশ করেছে, সেখানে বিদেশে নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলেছেন এমন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। এদের মধ্যে সম্ভাব্য অর্থ পাচারকারী রয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকজনের অর্থ বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ আছে। এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আট লাখ আট হাজার ৫৩৮ ব্রিটিশ পাউন্ড, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের এক কোটি ৬০ লাখ হংকং ডলার এবং গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের চার লাখ ১৮ হাজার ৮৫৩ ব্রিটিশ পাউন্ড বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ আছে। বিএনপির সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালুর ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার শেয়ার দুবাইয়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনের ৯ লাখ ২৯ হাজার ৬৭০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত এবং তার স্ত্রী রুবিনা খানমের ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৫২০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত ওই দেশে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫৯ হাজার ৩৪১ ব্রিটিশ পাউন্ড যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আরও কয়েকজনের পাচারের তথ্য উদ্ঘাটনের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে। এর মধ্যে এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হকের দুবাইয়ে ১৬৫ কোটি টাকা, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান সিঙ্গাপুরে এক কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু দুবাইয়ে সন্দেহভাজন ১৪৯ কোটি টাকা পাচারের তথ্য উদ্ঘাটনে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তালিকায় আরও আছেন ক্যাসিনো-কাণ্ড ফাঁসের পর বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের পরিচালক সেলিম প্রধানের যুক্তরাষ্ট্রে ১২ কোটি টাকা, বিসিবির পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার অস্ট্রেলিয়ায় চার কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের তিন কোটি টাকা ও মমিনুল হক সাঈদের চার কোটি ৪৭ লাখ টাকা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় পাচারের তথ্য উদ্ঘাটনের বিষয়টির আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে।

বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ৯২৪টি তথ্য বিনিময় হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশের কাছে ৭৯৬টি আবেদন করা হয়েছে। আর ১২৮টি আবেদন এসেছে বাংলাদেশের কাছে। এর মধ্যে নির্বাচনের আগের বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৪০৫টি তথ্য বিনিময় হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ ৩৮৮টি তথ্য নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ প্রধানত অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের কাজ করে। অন্যদিকে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এ বিষয়ে মামলার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দায়িত্বপ্রাপ্ত। এসব সংস্থায় বর্তমানে তিন শতাধিক মামলা চলমান রয়েছে।

মন্তব্য করুন