'সর্বাত্মক' লকডাউন শুরুর আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার যে যেভাবে পেরেছে রাজধানী ঢাকা ছেড়েছে। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ থাকায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও অটোরিকশায় গাদাগাদি করে গ্রামের দিকে ছুটেছে মানুষ। ঈদযাত্রার মতো ভিড় ছিল রাজধানীর প্রবেশপথে। নিষেধাজ্ঞা না মেনে অনেক বাস মহাসড়কে চলেছে যাত্রী নিয়ে। মাওয়া ও আরিচা ঘাটে যানবাহন ও গ্রামমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল দিনভর।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যদিও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে। দেখা যায়নি সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তৎপরতাও।

যাত্রীরা জানিয়েছেন, লকডাউনে রাজধানীতে কর্মহীন বসে থেকে সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ার মতো অবস্থা তাদের নেই, তাই বাড়ি চলে যাচ্ছেন। গত বছর লকডাউনে আটকা পড়ে খুব দুর্ভোগ সয়েছেন। তাই এবার চলে যাচ্ছেন। কলকারখানা, অফিসও বন্ধ- কী করবেন ঢাকায় থেকে! কেউ কেউ বলেছেন, ঢাকায় একা থাকেন, পরিবার গ্রামে থাকে। লকডাউনে থাকা-খাওয়ার কষ্ট। তার ওপর রোজা আসছে। তাই চলে যাচ্ছেন।

গতকাল দুপুরে গাবতলী এলাকায় দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষের ভিড়। টার্মিনাল থেকে কোনো বাস না ছাড়লেও গাবতলী সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস ভরে মানুষ যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গগামী একেকটি ট্রাক আসার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পিকআপে আরিচা ঘাট পর্যন্ত ২০০ এবং মাইক্রোবাসে ৪০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে যাত্রীপ্রতি। যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত এ ভাড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অনেকেই মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে আরিচা, চন্দ্রায় যাচ্ছেন ৫০০ টাকায়।

রাজধানীর বছিলা এলাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু পেরিয়ে বিকেলে দেখা গেছে, একের পর এক বাস যাচ্ছে যাত্রী বোঝাই হয়ে। যদিও ঢাকাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে গত ৭ এপ্রিল থেকে। অর্ধেক আসন খালি রেখে ৬০ শতাংশ বেশি ভাড়ায় বাস চলাচলের অনুমতি ছিল।

চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের নজরদারি থাকায় বাবুবাজার সেতু হয়ে বাস চলছে না। তাই বছিলা সেতু হয়ে গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে নবাবগঞ্জ, দোহার যাচ্ছেন যাত্রীরা। রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটের বাস 'রফরফ' 'তরঙ্গ প্লাস' এ সড়ক হয়ে লুকিয়ে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। 'তরঙ্গ প্লাস' রামপুরা থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চলাচল করে। এই পরিবহনের চালক মো. সবুজ জানালেন, যাত্রীপ্রতি ৩০০ টাকায় রহনপুর যাচ্ছেন।

সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায়ও ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। নানা কৌশলে অনেক গাড়ি ঢাকার বাইরে সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। এ জন্য যাত্রীদের গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া।

ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া 'সুরমা এক্সপ্রেস' পরিবহনের সুপারভাইজার বলেন, যাত্রীদের অত্যধিক চাপ। অনেকদিন ধরে তারাও কর্মহীন। তাই মালিককে বলে কয়ে বাস চালাচ্ছেন। পথে পুলিশ আটকালে 'ম্যানেজ' করে চলতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে সিলেটের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা। যদিও স্বাভাবিক সময়ে এ পথের ভাড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।

লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া 'জননী পরিবহন'র হেলপার বলেন, স্বাভাবিক সময়ে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এখন তারা এক হাজার টাকা ভাড়া নিচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা কুমিল্লাগামী ধানকাটার শ্রমিক নূর আলম জানান, অনেক কষ্টে ঢাকা পর্যন্ত এসেছেন। এখন কুমিল্লা পর্যন্ত তারা যেতে পারছেন না। অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা তাদের কাছে নেই। তাই বাসের ছাদে যাওয়া যায় কিনা, তার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের দলে সাতজন রয়েছেন।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আরিচা ঘাটে ছিল লাখো মানুষের ভিড়। ফেরি ও ট্রলারে গাদাগাদি করে তারা পদ্মা পার হয়েছেন। এ রুটের ১৭ ফেরির তিনটি বিকল থাকায় বাকিগুলোতে যানবাহন ও যাত্রী পার হয়। লঞ্চ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভিড়ের সুযোগ নিয়ে লঞ্চ স্টাফ ও ট্রলার মালিকরা চার পাঁচগুণ ভাড়া আদায় করেছেন।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, অভিন্ন অবস্থা ছিল মাওয়া-জাজিরা নৌরুটে। ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লকডাউনে নৌ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিল। জরুরি যানবাহন পারাপারে থাকা ফেরিগুলো গতকাল ছিল যাত্রী বোঝাই।


মন্তব্য করুন