মঙ্গল শোভাযাত্রা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসংখ্য মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত এক মিছিল। রং-বেরঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে হাতে ছোট-বড় মুখোশ নিয়ে উল্লাস করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে তরুণ-তরুণীর দল, মুখে আলপনা আঁকতে সার ধরে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন বয়সের মানুষ- এমনটি দেখতে বাঙালি অভ্যস্ত অন্তত তিন দশক ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এই শোভাযাত্রা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী ভারতেও। পশ্চিমবঙ্গ এবং শান্তিনিকেতনের শোভাযাত্রায় এখানকার ডিজাইন করা পোস্টারই ব্যবহূত হয়ে আসছে গত এক দশক ধরে।

অথচ বাঙালির ঐতিহ্য হয়ে ওঠা এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অনিচ্ছুক ছেদ পড়েছে গত বছর ২০২০ সাল থেকে করোনা মহামারির কারণে। এ বছর স্বল্প পরিসরে শোভাযাত্রাটি হওয়ার কথা থাকলেও ফের থমকে যেতে হয়েছে করোনাকালের বাড়বাড়ন্ত আক্রান্ত সংখ্যার কারণে। তবে একেবারে বাতিল হয়ে যাচ্ছে না শোভাযাত্রাটি। সিদ্ধান্ত হয়েছে, চারুকলা প্রাঙ্গণেই অল্প কয়েকজন মিলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করবে প্রতীকী এই শোভাযাত্রা।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য 'কাল ভয়ংকরের বেশে এবার আসে ঐ সুন্দর'। কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নিবীণা'র 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে লাইনটি। করোনা মহামারির আবহে এবার আমরা পা ফেলতে চলেছি নতুন বছরে- এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই নির্বাচন করা হয়েছে শোভাযাত্রার এমন প্রতিপাদ্য। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০০ জনকে নিয়ে শোভাযাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সে সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছেন উদ্যোক্তারা। চারুকলার ভেতরেই স্বল্প সময়ের প্রতীকী এ শোভাযাত্রা হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এবারের শোভাযাত্রায় করোনাকালে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করতে 'ফেস শিল্ড' ব্যবহার করে একশটি মুখোশ বানানো হয়েছে। ছোট ছোট কাগজ জোড়া দিয়ে বানানো হয়েছে শোভাবর্ধনকারী বড় মুখোশ। এসব মুখোশে রাজা-রানী ও মানুষের মুখ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। করোনা সচেতনতায় পরানো হয়েছে মাস্ক। ছোট মুখোশ বানাতে ফেস শিল্ডগুলোকে মুখোশের আদল দিয়ে লোকজ আবহে আঁকা হয়েছে প্যাঁচা বা বাঘের মতো প্রতি বছর ব্যবহার হওয়া নানা প্রতিকৃতি। এসব মুখোশ একই সঙ্গে শোভাযাত্রা করতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানতে সাহায্য করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রবিউল ইসলাম জানান, অন্যবারের মতো পশুপাখির বড় প্রতিকৃতি এবার আর বানানো হয়নি। অতীতে অনেক শিক্ষার্থী-শিক্ষক মিলে মুখোশ তৈরির কাজ করলেও এবার শুধু ১৩ থেকে ১৪ জন শিক্ষক এবং স্বল্প সংখ্যক বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী মিলে এসব বানিয়েছেন।

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন সমকালকে বলেন, 'এমন পরিস্থিতিতে রাস্তায় শোভাযাত্রা করার সুযোগ নেই। আমরা তাই চারুকলার ভেতরেই একটি সংক্ষিপ্ত প্রতীকী আয়োজন করে সেটির ভিডিও ধারণ করে সবাইকে প্রচার করতে দেব। প্রতিবারের মতো সকাল ৯টায় আয়োজনটি প্রচার করা হবে। সর্বোচ্চ ২৫ জন এই প্রতীকী আয়োজনে অংশ নেবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন ও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর এই আয়োজনে ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসকদের ব্যবহূত ফেস শিল্ডকে সৃজনশীলভাবে বিভিন্ন ডিজাইনে সাজিয়ে মুখোশ বানানো হয়েছে।'

মন্তব্য করুন