পুলিশের পিটুনিতে কৃষকের মৃত্যু

সালিশ বৈঠকে পাঁচ লাখ টাকায় রফা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় পুলিশ কর্মকর্তার পিটুনিতে নিখিল তালুকদার (৩২) নামে এক কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ৫ লাখ টাকায় মীমাংসা করা হয়েছে। সালিশ বৈঠক থেকে নিখিলের পরিবারকে নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩ লাখ টাকা ৫-৬ দিনের মধ্যে দেওয়া হবে বলে এ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া এ বৈঠক থেকে নিখিলের স্ত্রী ও ছোট ভাইকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেয়া হয়। তবে এ মীমাংসার ঘটনায় এলাকার অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বাঁচানোর জন্য এই বেআইনি কাজ করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে কোটালীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এ মীমাংসা বৈঠক করা হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস, পৌর মেয়র হাজি কামাল হোসেন শেখ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, সাবেক পৌর মেয়র এইচএম অহিদুল ইসলাম, রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা, কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ লুৎফর রহমান প্রমুখ এ সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কৃষক নিখিল কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল ইউনিয়নের রামশীল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

নিহত কৃষক নিখিলের ভাই শংকর তালুকদার বলেন, 'যে যাওয়ার সে চলে গেছে। পরিবারের কথা ভেবে ও পরিবারের সবাই ভালো থাকতে পারে, সে জন্য মীমাংসায় সম্মত হয়েছি। দুই লাখ টাকা দিয়েছে। বাকি ৩ লাখ আগামী ৫-৬ দিনের মধ্যে দেবে। পরিবারের দু'জনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছে।' কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ লুৎফর রহমান বলেন, 'উপজেলায় নিখিলের স্মরণে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সভার শুরুতে আমি ছিলাম। শোকসভা চলাকালেই আমি সেখান থেকে চলে আসি। পরে কী হয়েছে, তা আমি জানি না।'

এদিকে এ হত্যার অভিযোগের ঘটনায় গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার) আসলাম খানকে প্রধান করে শুক্রবার রাতে ৩ সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান।

আসলাম খান বলেন, 'এ ঘটনার মীমাংসার বিষয়টি ব্যক্তিগত। যে কেউ এটা করতে পারেন। এটি আমাদের তদন্তবহির্ভূত বিষয়। এখানে দেখার বিষয় হচ্ছে, পুলিশ কর্মকর্তা কী কী আইন লঙ্ঘন করেছেন। তিনি কী কী অপরাধ করেছেন। আমরা মাঠে নেমে তদন্ত করছি। সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করছি। তদন্ত কমিটি গঠন করার পর আমরা তদন্তে নেমে কাজ করছি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। আমরা আশা করছি, ৩/৪ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারব। আমাদের তদন্তে অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। সালিশ-মীমাংসা করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।' রামশীল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোকন বালা বলেন, আমি এ সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভায় নিখিলের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে পুরো ঘটনা মিটিয়ে ফেলা হয়েছে।

গোপালগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি ও জেলা সিপিবি সভাপতি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবু হোসেন বলেন, এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি দোষী পুলিশ কর্মকর্তাকে রক্ষায় তৎপর অপশক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

গত মঙ্গলবার বিকেলে রামশীল বাজারের ব্রিজের পূর্ব পাশে এলাকার নিখিলসহ ৪ জন বসে তাস খেলছিল। ওই সময় কোটালীপাড়া থানার এএসআই শামীম হাসান গোপনে মুঠোফোনে তাস খেলার দৃশ্য ধারণ করেন। এটা টের পেয়ে ৩ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও কৃষক নিখিলকে ধরে মারপিট করেন শামীম। এক পর্যায়ে হাঁটু দিয়ে পিঠে আঘাত করলে তার মেরুদণ্ড তিন খণ্ড হয়ে যায়। পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিখিলের লাশ তার গ্রামে দাহ করা হয়। এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা করা হয়নি।