প্রকৃতি

রূপসী শটিফুল

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

মোকারম হোসেন

রূপসী শটিফুল

সংখ্যায় কম হলেও শালবনে দেখা মেলে শটিফুলের - লেখক

বুনোফুল এত বর্ণিল ও হৃদয়গ্রাহী হতে পারে, শটিফুল না দেখলে তা বিশ্বাস হতো না। শুধু তা-ই নয়, ফুল হিসেবেও এটি কিছুটা ব্যতিক্রম। বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা কন্দ থেকে সরাসরি একটি মঞ্জরিদণ্ড বের হয়। নজরুলও শটির সৌন্দর্য আহরণে ভুল করেননি-

'বনফুলের তুমি মঞ্জরি গো।

তোমার নেশায় পথিক ভ্রমর ব্যাকুল হ'ল গুঞ্জরি

তুমি মায়ালাকের নন্দিনী নন্দনের আনন্দিনী...'

আবার চমৎকার ঔষধিগুণের জন্য ভিষকদেরও অনেক স্তুতিবাক্য জুটেছে শটির-

'শটী শঠী পলাশশ্চ ষড়গ্রন্থা সুব্রতা বধূঃ।

সুগন্ধমূলা, গন্ধালী শটিকা চ পলাশিকা'

দেশের অবশিষ্ট শালবন অঞ্চল, পাহাড়ের পাদদেশ ও পথের ধারে আপনাআপনিই জন্মায়। তবে দেশে ব্যাপক হারে শালবন ধ্বংস হওয়ায় শটিফুলও সংখ্যায় কমেছে। কারণ, জনবহুল এলাকায় শটিগাছ জন্মানোর কোনো সুযোগ নেই। সাধারণত প্রাকৃতিক বন-বাদাড়েই ওদের জন্ম ও বৃদ্ধি স্বাভাবিক। বছরের বেশিরভাগ সময় শটিফুলের দেখা পাওয়া যায় না। শীতঘুমের দীর্ঘ সময়ে মাটির ওপরে কোনো অস্তিত্বই থাকে না ওদের। কিন্তু বসন্ত বা গ্রীষ্ফ্মের একপশলা বৃষ্টিতেই ওদের কন্দমূলে এক ধরনের শিহরণ বয়ে যায়। তখন অসংখ্য লম্বাটে পাতার ঠাসবুননীতে ঝোপাল হয়ে ওঠে। মাটি ভেদ করে একটি লম্বা মঞ্জরিদণ্ড বেরিয়ে আসে। এ সময় শটিঝোপগুলো লাল, বেগুনি, হলুদ ও গোলাপি আভায় সুশোভিত হয়ে ওঠে।

শটি (Curcuma zedoaria) দেখতে হলুদ গাছের মতোই। স্থানীয় অন্যান্য নামের মধ্যে শঠি, সুগন্ধমূলা, সুভদ্রা, সৌম্যা, পলাশিকা ইত্যাদি অন্যতম। বর্ষজীবী গুল্ম বীরুৎ শ্রেণির গাছ। সাধারণত এক মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বসন্ত-গ্রীষ্ফ্মে ভাওয়াল, মধুপুর জঙ্গল ও বরেন্দ্র অঞ্চলে শটির সুদর্শন পুষ্পদণ্ড চোখে পড়ে। লালচে-বেগুনি রঙের ব্রাক্টের ভেতর হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল থাকে। গাছের গোড়ার কন্দ বা গেড় কর্পূরগন্ধি, মাটির নিচে সমান্তরালভাবে আদা বা হলুদের মতো ছড়ানো স্বভাব। এতে আছে সিনিওল সেসকুইটারপিন। পেটফাঁপা ও নানা ধরনের চর্মরোগে ব্যবহার্য। আগের দিনে জ্বর হলে বার্লির মতো করে কন্দের ক্বাথ খাওয়ানো হতো। লাল আবির তৈরিতে সুবাসিত কন্দের গুঁড়া ব্যবহূত হয়। কোনো কোনো জনগোষ্ঠীতে শটির কন্দ খাওয়া হয়। ছয়শ' শতাব্দীর দিকে আরবদের মাধ্যমে গাছটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।