চুরি করেন স্বামী ক্যাশ নেন স্ত্রী

৪ মিনিটেই মোটরসাইকেলের ঘাড় লক ভাঙতে দক্ষ সাগর

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

সাহাদাত হোসেন পরশ

রাস্তার পাশে বা কোনো বাণিজ্যিক এলাকায় মোটরসাইকেল পার্ক করে কোনো জরুরি কাজে যেতে পারেন। কিংবা কোনো দোকানে কেনাকাটা করতেও যেতে পারেন। তবে মোটরসাইকেল পার্ক করার আগে সতর্ক না হলে ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপদ। অল্প সময়ের মধ্যে প্রিয় এই যানবাহনটি আপনার হাতছাড়া হতে পারে। এরই মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ মোটরসাইকেল চোরচক্রের সন্ধান মিলেছে। ওই চক্রের দলনেতা হলেন চাঁদ রহমান সাগর (৩০)। দীর্ঘদিন ধরে সাগর মোটরসাইকেল চুরি করছেন এবং তার স্ত্রী মাকছুদা বেগম চোরাই গাড়ি বিক্রির ক্যাশ গ্রহণ করে আসছিলেন। স্বামী-স্ত্রী একটি গ্রুপ তৈরি করে কৌশলে মোটরসাইকেল চুরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে আসছিলেন। এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সাগর ও তার স্ত্রীসহ এই চক্রের সাতজন।

সাগরের কাছে মোটরসাইকেল চুরির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, মোটরসাইকেল চুরি থেকে বিক্রি পর্যন্ত চারটি চক্র রয়েছে। প্রথমে একটি চক্রের সদস্যরা মোটরসাইকেল মালিকের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। মোটরসাইকেল পার্ক করে তিনি কোথায় যাচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করেন তারা। দু-এক মিনিটের মধ্যে মালিক চলে আসার সম্ভাবনা থাকলে আর ওই মোটরসাইকেল চুরির টার্গেট নেন না তারা। যদি দেখা যায় মোটরসাইকেলের মালিকের আসতে দেরি হবে, তাহলে মনিটরিং টিমের সদস্যরা সাগরকে অবহিত করেন। এরপর সাগর এসেই চার মিনিটের মধ্যে মোটরসাইকেলের সামনের ঘাড় লক ভেঙে দ্রুত পালিয়ে যান। এ সময় মোটরসাইকেল নিজেই চালিয়ে নেন সাগর।

সাগর আরও জানান, একসময় আশুলিয়ায় পোশাক বিক্রি করতেন তিনি। সেখানে মিলটন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই মিলটনই তাকে মোটরসাইকেল চুরির দীক্ষা দেন। তবে পরে মিলটন চুরির পেশা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেও সাগর তা চালিয়ে যান। একেকটি মোটরসাইকেল ২০-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাগরের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ সদরের নলডাঙ্গার খড়াশিনিতে। আশুলিয়া ছাড়াও রাজধানীর ভাটারায় তার বাসা রয়েছে। মাসে ১৫টি মোটরসাইকেল চুরির টার্গেট করেন তিনি। মোটরসাইকেল চুরির পর একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপের কাছে বিক্রি করে বিকাশে টাকা গ্রহণ করা হয়। বিকাশে মোটরসাইকেল চুরির টাকা তোলেন সাগরের স্ত্রী মাকছুদা বেগম। মূলত তিনি স্বামীর ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মূলত মোটরসাইকেল চুরির আগে রেকির কাজটি করে থাকেন সাগরের খালাতো ভাই মুকুল হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের গৌরীনাথপুরে। মুকুলকে এই পেশায় নামিয়েছেন সাগর।

মুকুল সমকালকে জানান, একেকটি মোটরসাইকেল চুরি করতে পারলে তাকে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেল মালিকের ওপর নজরদারির বাইরে তার তেমন দায়িত্ব থাকে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাগর চোরাই মোটরসাইকেল প্রায় নিয়মিত যাদের কাছ থেকে বিক্রি করতেন, তারা হলেন- টাঙ্গাইলের নাগরপুরের সুধীর চন্দ্র দাস, দীপু মালাকার, মাসুম দেওয়ান, আরিফ মাতুব্বর ও ধামরাইয়ের আল-ইসলাম। দীপু মালাকার সমকালকে জানান, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তার একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ রয়েছে। সেখানে প্রায় নিয়মিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল মেরামত করতে যেতেন সাগর। এভাবে তার সঙ্গে সাগরের পরিচয়। পরে জানতে পারেন, সাগরের কাছে থাকা সব মোটরসাইকেল চোরাই। পরে সাগরের কাছ থেকে চারটি চোরাই মোটরসাইকেল কিনে নেন। একেকটি মোটরসাইকেল ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা লাভে আবার অন্যদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন দীপু মালাকার। প্রকৃত কাগজপত্র ও নম্বরপ্লেট ছাড়াই এসব মোটরসাইকেল হাতবদল করতেন তারা।

ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায়ই মোটরসাইকেল চুরির তথ্য পাওয়া যায়। একাধিক লক দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে চুরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সাগরের নেতৃত্বে যে চক্রটি মোটরসাইকেল চুরি করে আসছিল, তারা এ ধরনের কাজে খুব দক্ষ। এই চক্রের আরও কয়েকজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এই গ্রুপের কাছে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা, বনানী ও খিলক্ষেত এলাকা থেকে তারা বেশি মোটরসাইকেল চুরি করেছে।