হাসপাতালের কেনাকাটায় দুর্নীতি তদন্তে দুদক

স্বাস্থ্যসেবায় অরাজকতা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

হকিকত জাহান হকি

সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা পাবে- এটা যেন সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতোই ব্যাপার। হাসপাতালে গরিবের চিকিৎসা নেই- এটাই নির্মম সত্য। গরিব মানুষ হাসপাতালে গিয়ে টিকিট পাবে না, ডাক্তার দেখাতে পারবে না, ওষুধ পাবে না- এটিই নিত্যদিনের চিত্র।

দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা হাসপাতালগুলোর এ প্রথা ভাঙতে চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার করে গরিবের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করেছে দুদক। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠন করা হয়েছে বিশেষ অনুসন্ধান টিম। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে হাসপাতালের কেনাকাটায় লাগামহীন দুর্নীতির কারণেই স্বাস্থ্যসেবায় চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে। এ কারণে টিমের সদস্যরা কেনাকাটার হিসাব-নিকাশে হাত দিয়েছেন। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী এই টিম সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের কেনাকাটার হিসাব খতিয়ে দেখছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন পরিচালক সমকালকে বলেন, মানুষের চিকিৎসার জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দেয় আর সেই টাকা নানা কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়। এটা চলতে পারে না।

এখন থেকে দুদক প্রতিটি হাসপাতালের খরচের হিসাব তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবে। চিকিৎসাসেবার একটি টাকাও যারা আত্মসাৎ করবে, তাদের রেহাই নেই। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। তাদের সম্পদ খুঁজে বের করা হবে। অবৈধ সম্পদ ক্রোক করতে আদালতে আবেদন জানানো হবে। সমাজের নিরীহ, অসহায়, গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দুদক প্রতিটি হাসপাতালের হিসাব খতিয়ে দেখবে।

সূত্র জানায়, দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে হাসপাতালের সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থ বরাদ্দের আগেই টেন্ডার আহ্বান, মালামাল সরবরাহের আগেই ঠিকাদারের টাকা পরিশোধ, একই ঠিকাদারের বারবার অংশগ্রহণ, স্পেসিফিকেশন (সুনির্দিষ্ট ধরন ও মান) অনুযায়ী মালামাল না দেওয়া, ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ, বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে মালামাল কেনা। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেনাকাটায় জাল-জালিয়াতি

করে অর্থ আত্মসাতে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ রয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, পর্যায়ক্রমে ওইসব জালিয়াতি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করা হবে।

দুদকের উপ-পরিচালক সামছুল আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ টিম এরই মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত হাসপাতালের তালিকা তৈরি করেছে। টিমের সদস্যরা এই তালিকা ধরে কাজ শুরু করেছেন। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী, উপ-সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান ও ফেরদৌস রহমান।

সূত্র জানায়, লাগামহীন দুর্নীতির কারণেই সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবাদানে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে সমাজের দরিদ্র মানুষের ঠাঁই নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে তৈরি হয়েছে বৈষম্যের দেয়াল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালগুলোতে সরকারি নজরদারি নেই বললেই চলে। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বার্ষিক বরাদ্দ দিয়েই কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ। ওই টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে, কোন কোন খাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার হিসাব খতিয়ে দেখা হয় না। দীর্ঘদিন পর হলেও এই হিসাব নিতে শুরু করেছে দুদক।

দুদক সূত্র জানায়, বরাদ্দ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ওই টাকা লুটে নেওয়ার হিড়িক পড়ে হাসপাতালগুলোতে। কেনাকাটার নামে লোপাট করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কেনাকাটার নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়নি- এমন হাসপাতাল খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এরই মধ্যে দুদকের ওই বিশেষ টিম কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও সাতক্ষীরা জেলা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যন্ত্রপাতি কেনার নামে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে। এ অভিযোগে পৃথক মামলা করা হয়েছে। কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে কেনাকাটায় অর্থ আত্মসাৎ মামলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানি আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমসহ দশজনকে আসামি করা হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যন্ত্রপাতি কেনার নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জেলার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

আরও কিছু হাসপাতালের কেনাকাটার হিসাব অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলার সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটাও খতিয়ে দেখা হবে।

ইতিমধ্যে ১৩টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও তিনজন সিভিল সার্জনের কাছে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের কেনাকাটার নথি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, কুষ্টিয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল, টাঙ্গাইলের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং সিলেট, বগুড়া ও গাইবান্ধা সিভিল সার্জন।

জানা গেছে, দুদকের এই অনুসন্ধান কার্যক্রমের ফলে মেডিকেল কলেজ হাসপতালগুলোর কেনাকাটায় সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। আতঙ্কে অনেক হাসপাতালের কেনাকাটার হার কমে গেছে।

আরও যেসব হাসপাতালে অনুসন্ধান চলবে : দুদকের অনুসন্ধান তালিকায় আরও কিছু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। এগুলো হলো- ফেনীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল, জামালপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, সুনামগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল, ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, মানিকগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, ঢাকার মুগদার ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল।

মৌলভীবাজারের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সৈয়দপুরের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অ্যাজমা সেন্টার, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পিরোজপুর সদর হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার স্যার সলিমুলল্গাহ মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতাল, নড়াইল ১০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতাল।

লক্ষ্মীপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল, গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতাল, নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, কক্সবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল, নাটোর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতাল, মাদারীপুর জেলা সদর হাসপাতাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল, ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকার মহাখালীর জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতাল, শরীয়তপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল, লালমনিরহাট ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল।

হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, যশোর মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুরের ম্যাটস, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ, সাতক্ষীরার আইএইচটি, সাতক্ষীরার ম্যাটস, টাঙ্গাইলের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, নোয়াখালীর আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ, জামালপুরের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী আইএইচটি, শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য হাসপাতালের কেনাকাটার হিসাব অনুসন্ধান করা হবে।