কোরবানির পশুর হাট

জমজমাট বেচাকেনা

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

জমজমাট বেচাকেনা

পছন্দের গরুটি কেনার পর বাড়ি ফিরতে গিয়েও শনিবার অনেককে পড়তে হয়েছে এমন মধুর বিড়ম্বনায়। রাজধানীর গাবতলী হাট থেকে ফেরার ছবি- মাহবুব হোসেন নবীন

ঝিনাইদহের দুর্গাপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ ডেইরি ফার্মের মালিক শাহ আলম মিয়া পাঁচটি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গরুটির নাম যুবরাজ। যুবরাজের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪০ লাখ টাকা। এ গরুটিই গাবতলী হাটের মূল আকর্ষণ। পশুটা ঘিরে ক্রেতা ও উৎসাহীর ভিড়ের অন্ত নেই। বিশাল আকৃতির কালো রঙের ব্রাহামা প্রজাতির গরুটির সঙ্গে তরুণ-কিশোররা সেলফি তুলছে। শাহ আলম মিয়ার দু'জন সহযোগীও ভিড় সামলাতে তটস্থ। শাহ আলম মিয়া জানান, ইতিমধ্যে ১৫ লাখ টাকা দাম উঠেছে। তিনি রাজি হননি। ৩০ লাখের ওপরে গেলে বিবেচনা করবেন। কারণ, চার বছর ধরে গরুটি লালনপালন করতেই তার প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন যুবরাজের পেছনে তার খাবার দিতে হয়েছে ৫০০ টাকার। ভুসি, খৈল, খড়, কুঁড়া, চালের গুঁড়া, ছোলা খাবার দিতে হয়। যুবরাজকে পালার জন্য একজনকে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস। সব মিলিয়ে খরচের হিসাব করা মুশকিল।

যুবরাজের মতো এ রকম অনেক গরু উঠেছে গাবতলী পশুহাটে। এগুলোর নামও বাহারি। বিগ বস, কালা তুফান, রাজাবাবু, কালু, লালু, পাগলু, রাজাবাহাদুর প্রভৃতি।

বড় পশু গাবতলী হাটে :কুষ্টিয়ার দরবেশপুরের আরুশা ডেইরি ফার্ম থেকে হাটে তোলা ডনের ওজন ৩৫ মণ, বেল্টুর ওজন ২৫ মণ, লাল্টুর ওজন ১৭ মণ। এগুলোরও দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। কালোসাদা রঙের রাজাবাবুর দাম চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ, রাজাবাহাদুর ২০ লাখ, ব্ল্যাক ডায়মন্ড ১৫ লাখ, বীরবাহাদুর ২৫ লাখ। কিন্তু গতকাল গাবতলী হাট ঘুরে দেখা গেছে, খুব বড় আকৃতির গরুর ক্রেতা খুবই কম। ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা দামের মধ্যে থাকা পশুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। হাটের পরিচালনা কমিটির সদস্য সানোয়ার হোসেন বলেন, খুব বড় আকৃতির গরুর ক্রেতারা একটু পরে আসেন। অনেকে গরু দেখে পছন্দ করে যান। ঈদের আগের দিন হাটে গিয়ে কেনেন।

হাট ঘুরে দেখা গেছে, পশুর কমতি নেই। ছাগল, ভেড়া, মহিষ, দুম্বা ও উটও আছে। খাসি-ছাগলের চাহিদা থাকলেও উট-দুম্বার তেমন চাহিদা নেই। উট-দুম্বার মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই গাবতলী হাটে তিনি উট-দুম্বা আর নেপালি গরু নিয়ে আসেন। ভারতের রাজস্থান, গুজরাটের মরুভূমি এলাকা এবং হরিয়ানা থেকে উট ও দুম্বা আমদানি করেন। এবার একটি উট বিক্রি হয়েছে। আরও তিনটি রয়েছে।

একেকটি উটের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। আর দুম্বার আকার অনুযায়ী দাম হাঁকানো হচ্ছে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। তবে গতকাল দুপুর পর্যন্ত কোনো দুম্বা বিক্রি হয়নি।

৪৫০ পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মাহবুব হোসেন ও তার ভাই মিলে গাবতলী হাট থেকে দুটি গরু কিনেছেন। একটি ১ লাখ। আরেকটি এক লাখ ১৫ হাজার টাকায়। প্রতিটিতে ৫ মণ করে মাংস হবে বলে তার ধারণা। তিনি বলেন, 'পশুর দাম গতবারের তুলনায় বেশি বলা যাবে না। আর বাজারেই প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫০০ টাকা। কোরবানির পশুর মাংসের দাম তো বাজারের মাংসের দামের হিসাব করলে চলবে না।'

তবে ৮২ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছেন ওয়াকিল আহমেদ। তিনি বলেন, এবার গরুর দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। কারণ যে গরুটি তিনি কিনেছেন, এটার দাম ৬০ হাজার টাকা হলে ঠিক ছিল। মাংস হতে পারে ৩ মণ।

উত্তরা হাটে দামও বেশি পশুও বেশি :উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের পশুর হাটের ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, গত বারের চেয়ে এবার পশুর দাম বেশি। উত্তরার বাসিন্দা আকবর আলী জানান, মুষলধারে বৃষ্টি হলে পশুর দাম অনেকটা সহনীয় হতো। দাম কমের আশায় ঈদের আগের রাতে গরু কেনার চিন্তা করছেন অনেকে। পাবনার বেড়া থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আমির হোসেন জানান, হাটে প্রচুর পশু উঠলেও ক্রেতার সংখ্যা কম। হাট থেকে গরু কেনা কামাল হোসেন বলেন, ৯০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছেন। দাম খুব চড়া মনে হয়েছে তার। তারপরও গরুটি পছন্দ হওয়ায় কিনে ফেলেছেন।

সিরাজগঞ্জের চৌহালী থেকে আসা খামারি করিম উল্লাহ জানান, ট্রাকে করে আনতে গরুপ্রতি ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া অন্যান্য খরচও বেশি। সেই তুলনায় দাম কম।

হাটটিতে ছোট আকারের ছাগল বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ১৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের ছাগলের বেশি চাহিদা। এসব ছাগলের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৬ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

পুরান ঢাকায় জমে উঠেছে কেনাবেচা :ভাই, লাল গরুটা কত? এক দাম এক লাখ ২০ হাজার। এত দাম কেন ভাই? এটা তো ৬৫ হাজারের বেশি হবে না। সত্তরে দেবেন? একের কম হবে না। ঈদের দু'দিন আগে গতকাল শনিবার দুপুরে ধূপখোলা মাঠে বসা অস্থায়ী পশুহাটে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে এমন কথোপকথন চলছিল। ক্রেতা মহসিন আলী যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছেন পছন্দের পশু কিনতে। প্রায় দু'ঘণ্টা ঘোরার পর ওই লাল গরুটাই পছন্দ হলো তার। দরদাম শেষে মহসিন আলী ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে গরুটি কেনেন। তিনি জানান, দু'দিন ঘুরে এই গরুটা পছন্দ করেছেন। তাই একটু দাম হলেও কিনলেন। বিক্রেতা জামালগঞ্জের জয়নাল জানালেন, তিনি ১২টি গরু এনেছেন। চারটি বিক্রি হয়েছে। আজকালের মধ্যে বাকিগুলো বিক্রি হয়ে যাবে। বৃহস্পতি-শুক্রবার ক্রেতা কম ছিল। যারা এসেছেন দরদাম করে চলে গেছেন। গতকাল থেকে বেচাবিক্রি ভালো।

গতকাল রাজধানীর পুরান ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতার সমাগম ভালো। চলছে দরদাম। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। অনেকেই কোরবানির পশু কিনে ঘরে ফিরছেন। আবার অনেকেই ঘুরে ঘুরে পছন্দের পশু কিনতে পারছেন না। কারণ হিসাবে মিলছে না। তাদের অভিযোগ, এবার দাম খুব বেশি চাচ্ছে বিক্রেতারা। কমলাপুর স্টেডিয়াম-সংলগ্ন বিশ্বরোড ও গোপীবাগ, শনিরআখড়া ও দনিয়া মাঠ, ধূপখোলা মাঠ, কাউয়ারটেক মাঠ ও পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন পশুর হাটের চিত্র প্রায়ই একই রকম। গোপীবাগের অস্থায়ী হাটে কথা হয় আফতাব হোসেনের সঙ্গে। বেসরকারি ব্যাংকের এই কর্মকর্তা জানালেন, রোববার পর্যন্ত ব্যাংক খোলা থাকায় এবার পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই ঈদ করতে হচ্ছে। কোরবানির জন্য একটা খাসি কিনতে চান। কিন্তু দাম বেশি মনে হচ্ছে। সাত হাজার টাকা বাজেট ছিল কিন্তু মনে হচ্ছে আরও বেশি খরচ করতে হবে। এই হাটে সিরাজগঞ্জের গরু ব্যাপারি আমিনুল জানালেন, শুক্রবার বিকেল থেকে বিক্রি বেড়েছে। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচও বেশি। সেই তুলনায় দর খুব বেশি বাড়েনি। এই হাটের হাসিল কাটার দায়িত্বে থাকা মারুফ জানালেন, এখন ক্রেতা আসছে। বিক্রি হচ্ছে ভালো। তিনি জানালেন, রোববার বেচাকেনা বেশি হবে। কারণ অনেক ক্রেতা আশা করেন শেষ দিন দাম কম হবে। তিনি জানালেন, হাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। পশু বিক্রেতা ও ক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। পশু অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

আফতাবনগর হাট :ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত কয়েক দিনে গরুর দাম অনেকটাই কমেছে। মাঝারি আকারের যে গরুর দাম তিন দিন আগেও দেড় লাখ টাকা হেঁকেছিলেন ব্যাপারিরা, এখন তা এক লাখ থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের যে গরুর দাম শুরুতে ৭০-৮০ হাজার টাকা হাঁকছিলেন বিক্রেতারা, এখন তা ৫৫ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন।

তারপরও কেউ কেউ আরও কিছুটা দর কমার অপেক্ষায় আছেন, ঘুরে ঘুরে দেখছেন, যাচাই করছেন। এর মধ্যে কাঙ্ক্ষিত দরে বনে গেলে পশু কিনেই বাড়ি ফিরছেন। কুষ্টিয়া থেকে আসা গরুর খামারি বিল্লাল জানালেন, গত দুই দিনে গরুর দাম ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। এর কারণ- হাটে যে পরিমাণ গরুর আমদানি হয়েছে, ক্রেতা তার তুলনায় কম। গুলশানের বাসিন্দা লোকমান এক লাখ ৩৫ হাজার টাকায় গরু কিনে ফিরছেন। বেশ কম দামে গরু কিনতে পেরে খুশি তিনি।

মাঝারি আকারের গরুর বেশ চাহিদা। ছোট এবং বড় গরুর চাহিদা কম। নাটোরের সিংড়া থেকে গরুর খামারি বাবলু এসেছেন ২২ মণ ওজনের এক গরু নিয়ে। গত বৃহস্পতিবার গরু আনার পর প্রথমে সোয়া পাঁচ লাখ টাকা দাম হেঁকেছিলেন। তার দাবি, ওই দিন একাধিক ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা দাম দিতে চাইলেও গত দুই দিনে কেউ আর ওই দাম দিতে রাজি হচ্ছেন না। অবস্থা এমনই যে, এখন সোয়া চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা দাম পেলে বিক্রি করে দেবেন তিনি।

জামালপুর থেকে আসা গরুর খামারি মোস্তাকিম এসেছেন 'টাইগার' নামের বড় একটি গরু নিয়ে, যার ওজন ২৫ মণ। শুরুতে ১০ লাখ টাকা দর হাঁকলেও এখন বলছেন আট লাখ হলে ছাড়বেন। এর কম হলে গরু নিয়ে ফিরে যাবেন। এ বিক্রেতা জানান, তিনি খামার থেকেও বেশ কয়েকটি গরু বিক্রি করেছেন। চাইলে খামার থেকেই এ গরুটি সাত লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতেন। বেশি দামের আশায় গরুর হাটে এনে বিপদে পড়েছেন।