ডেঙ্গুর প্রভাব ঈদবাজারে

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০১৯      

সাজিদা ইসলাম পারুল

রোববার। ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ২টা পার করেছে। অথচ সকাল ১০টা থেকে এ সময় পর্যন্ত কোনো ক্রেতার দেখা পাননি রাজধানীর মিরপুরের বেনারসিপল্লীর 'জুয়েনা শাড়িস'-এর বিক্রয়কর্মীরা। একই চিত্র ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের শাড়ির দোকানগুলোতে। এ মার্কেটের সিল্ক্ক সেন্টার সিটিতে সারাদিন পর বিকেল ৫টায় তিন হাজার টাকায় একটি শাড়ি বিক্রির মধ্য দিয়ে 'বনিবনা' শুরু হয়েছে। অথচ আর পাঁচ দিন পরই ঈদুল আজহা।

গত বছর কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে বেনারসিপল্লীর জুয়েনা শাড়িস দোকানের কর্মীরা প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার শাড়ি বিক্রি করেছেন। এ দোকানের বিক্রয় ব্যবস্থাপক শেখ মো. রফিক সমকালকে বলেন, বিগত কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে ৬০-৭০ হাজার টাকার শাড়ি বিক্রি করেছেন তারা। এখন ক্রেতাশূন্য মার্কেট।

শুধু রোববার নয়, গতকাল সোমবার গুলশান আড়ং এবং সংলগ্ন দেশীদশেও ছিল একই চিত্র। একজন বিক্রয়কর্মী জানালেন, আড়ংয়ে এই সময়ে সর্বনিম্নসংখ্যক ক্রেতা আসছেন। ঈদ নয়, সাধারণ সময়েও এর বেশি ক্রেতা তারা পেয়ে থাকেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, হুট করেই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে কারও না কারও মৃত্যুসংবাদ শুনতে হচ্ছে। ডেঙ্গুর কারণে স্বজন হারিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আশপাশের মানুষের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে বন্যা, শেয়ারবাজারে ধস- সব মিলিয়ে নাগরিকদের মধ্যে এখন আর ঈদের আনন্দ নেই। ফলে ঈদ কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানে ক্রেতার তেমন চাপ নেই।

বেনারসিপল্লীর ব্যবসায়ীরা জানালেন, সাধারণত যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় বছরজুড়েই দূরের ক্রেতারা আর খুব একটা আসছেন না। তবে ঈদ মৌসুমে আগে বিক্রিবাট্টা ভালো হতো। এবার কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে বিক্রির কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। তারা জানান, শেষ সময়ে বিক্রির আশা থাকে। এবার তাও নেই। শেষ দিকে ব্যবসা জমবে এমন আশায় তারা ক্রেতাদের সাধ ও সাধ্যের দিক বিবেচনায় রেখে ঐতিহ্যবাহী দেশি বাহারি শাড়ির পসরা সাজিয়েছেন। এসব শাড়িতে কারিগরদের সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে দেশের ঐতিহ্য। এর মধ্যে রয়েছে কাতান, গাদোয়াল, ইক্কত, তসর, মটকা, মেঘদূতসহ হরেক রকমের শাড়ি। মূল্যভেদে এগুলোর দাম ৮০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

'গুলশান শাড়ি'র বিক্রয়কর্মী সোহাগ জানান, বিচ্ছিন্ন দু-একজন ক্রেতা আসছেন; বিক্রিও হচ্ছে কিছু শাড়ি। তবে ঈদবাজার বলতে যা বোঝায়, তা বেনারসিপল্লীতে এখন নেই।

গোল্ডেন বেনারসির বিক্রয়কর্মী জানান, কিছু পাইকার ঈদের আগে শাড়ি কিনে নিলেও বর্তমানে বিক্রি খুব কম। মেরুল বাড্ডা থেকে শাড়ি কিনতে আসা সোহেল রহমান জানান, দেশের পরিস্থিতি ভালো নেই। ঘরে ঘরে ডেঙ্গু আতঙ্ক। এ ছাড়া বন্যার্তদের করুণ দশা দেখে দেশের অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ফলে অনেকের মাঝেই ঈদের আনন্দ তেমন নেই। তার পরেও বাধ্য হয়েই শাড়ি কিনতে হয়েছে। কারণ ঈদের পরপরই পরিবারের একজনের বিয়ের অনুষ্ঠান হবে।

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায় ক্রেতাসমাগম তেমন নেই। বছরজুড়ে জিনিসপত্র কিনতে যেমন ক্রেতা আসেন, ঈদকে ঘিরে তেমনই ক্রেতার সমাগম দেখা গেছে। কোনো কোনো মার্কেটে তাও নেই। অথচ নিম্নবিত্ত-উচ্চবিত্তসহ সব শ্রেণির মানুষ এই মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসেন।

ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটে সারিবদ্ধ কাপড়ের দোকানে মালিক-কর্মচারীরা বসে রয়েছেন। হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া সব দোকান ক্রেতাশূন্য। একই অবস্থা রাজধানীর অন্যান্য মার্কেটেও। মৌচাক, পলওয়েল মার্কেট, গাজী ভবন শপিং সেন্টার, যমুনা ফিউচার পার্কসহ অন্যান্য বিপণিবিতানেও ক্রেতা নেই।

হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ী ওয়াসিম ফারুক সমকালকে বলেন, দু-একজন ক্রেতা পোশাক নেড়েচেড়ে দেখেন। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না। অথচ আগে একই সময়ে লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রি হতো। ডেঙ্গুর কারণেই হয়তো ক্রেতা আসছে না বলে মনে করেন তিনি।

চন্দ্রিমা মার্কেটে আসা সানজিদা আফরোজ শান্তা বলেন, 'সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রভাব অবশ্যই বাজারে পড়েছে। ইতিমধ্যে অনেক পরিবারের সদস্য ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। আবার অনেক পরিবারের সদস্য মারা গেছেন। এসব কারণে মানুষের মধ্যে ঈদের আমেজ নেই। খুব বাধ্য না হলে কেনাকাটা করতে আসছেন না কেউ।'

দেশের জনপ্রিয় শপিং মল বসুন্ধরা সিটির পোশাক বিক্রেতারাও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সোমবার জানালেন অন্য বছরগুলোর মতো এ বছর বিক্রি তেমন একটা নেই। মল ঘুরে দেখা যায়, লোকসমাগম থাকলেও মেয়েদের তৈরি পোশাক বিপণিগুলো অনেকটাই ফাঁকা। দোকানের কর্মীরা জানালেন তাদের হতাশার কথা। এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন পোশাক ও প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজানো হয়েছে। কিন্তু অন্য বছরগুলোর মতো ক্রেতার ভিড় নেই। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, সম্প্রতি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারের লোকজন ছাড়াও আত্মীয়-বন্ধুবান্ধব আতঙ্কে রয়েছেন। সেই প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়েছে।

এই শপিং মলের লেভেল ফোরের 'শালিমার' শাড়ির দোকানিরাও অনেকটা ক্রেতাদের পথ চেয়ে আছেন। বেচা-বিক্রি কেমন জানতে চাইলে বিক্রয়কর্মী শরিফ আহমেদ বলেন, এটাকে তো আর ঈদের বাজার বলা যায় না। খুবই খারাপ অবস্থা। আগের মতো আর বিক্রি নেই।

ডেঙ্গুর প্রভাব পড়েছে দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোতে : ঈদের আয়োজন নিয়ে দেশি ফ্যাশন হাউসগুলো সবসময়ই ভিন্নতা আনে। এক বছর আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজাইনাররা পোশাকের মোটিফ, প্যাটার্ন, বৈচিত্র্য আনতে কাজ শুরু করেন। সবকিছুর মূলেই থাকে ক্রেতাদের চাহিদা। অথচ এবারের কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না ফ্যাশন হাউসগুলোর কর্তাব্যক্তিরা। 'বিশ্বরঙ'-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জানান, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত সাত দিন ধরে তার সহধর্মিণী শম্পা সাহা শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, 'শপিংটা আসলে শহরকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। চারপাশে সবকিছু মিলিয়ে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। তা ছাড়া বিভিন্ন কারণে মানুষের আয়-রোজগারও এখন অনেক কম হয়। তাই যতদূর সম্ভব, মানুষ কেনাকাটা করতে চায় না। শুধু পরিবারের শিশুদের জন্য কিছু কেনাকাটা করেন।