ডেঙ্গু ট্র্যাজেডি

ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্ন নিয়েই চলে গেলেন শাপলা

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০১৯      

ইন্দ্রজিৎ সরকার

ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্ন নিয়েই চলে গেলেন শাপলা

স্বামী-সন্তানের সঙ্গে শারমিন আক্তার শাপলার এই ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। সোমবার ভোরে ডেঙ্গু আক্রান্ত শাপলা মারা গেছেন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে : সংগৃহীত

প্রায় আট মাস ধরে নিজের গর্ভে একটি প্রাণের অস্তিত্ব পরম যত্নে বড় করে তুলছিলেন শারমিন আক্তার শাপলা। তার চলাফেরা ও খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে ছিল সাবধানতা, বাছবিচার। চিকিৎসকের পরামর্শও নিচ্ছিলেন নিয়মিত। এ সবই করছিলেন অনাগত সন্তানকে নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য। শাপলা-নাজমুল দম্পতির একটি ছেলে রয়েছে। এরপর তারা দু'জনই খুব করে চাইছিলেন- কোলজুড়ে আসুক ফুটফুটে একটি মেয়ে। কিছুদিন আগে ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, এবার পূরণ হচ্ছে তাদের মনোবাসনা। তখন থেকেই খুশিতে ডগমগ করছিলেন তারা। সেই খুশি ছড়িয়েছিল স্বজনের মাঝেও। সব ঠিক থাকলে যথাসময়ে ভূমিষ্ঠ হতো কন্যাশিশুটি। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! সন্তানের জন্ম দেওয়ার আগেই গতকাল সোমবার ভোরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় শাপলার। সেইসঙ্গে মায়ের গর্ভেই ঝরে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন। এদিকে শাপলার পরিচর্যা করতে গিয়ে তার ছোট ভাই জুয়েলও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ূয়া বলেন, 'সংকটাপন্ন অবস্থায় রোববার দুপুরে তাকে জয়পুরহাট থেকে এনে এখানে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ভোর ৫টার দিকে মৃত্যু হয় তার।'

৩২ বছর বয়সী শাপলা গৃহিণী ছিলেন। তার স্বামী নাজমুল হক আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক। দেড় বছরের প্রশিক্ষণে সম্প্রতি তিনি কোরিয়ায় যান। এর আগ পর্যন্ত এই দম্পতি আগারগাঁওয়ে আবহাওয়া অফিসের কলোনিতে থাকতেন। বিদেশে যাওয়ার আগে গত ৩০ জুলাই নাজমুল তার স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যান শ্বশুরবাড়ি জয়পুরহাটে। সেখানে শহরের শান্তিনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় রাখা হয় তাদের। ঢাকার বাসার সব মালপত্রও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

মৃতের ভগ্নিপতি আনিসুর রহমান জানান, নাজমুল হক বিদেশে যাওয়ার পর ২ আগস্ট জ্বরে আক্রান্ত হন শাপলা। প্রথমে তাকে জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা ঢাকায় আনার পরামর্শ দেন। রোববার তাকে সোহওরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে এসবের কিছুই তার স্বামীকে জানানো হয়নি। কারণ অসুস্থতার খবর জানালে নাজমুল চিন্তিত হয়ে পড়বেন, তাই তাকে জানাতে নিষেধ করেছিলেন শাপলা। অবশ্য গতকাল ভোরে তার মৃত্যুর পর খবরটি জানানো হয়। গতকালই নাজমুল দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। মধ্যরাতে তার দেশে পৌঁছার কথা। এরপর তারা লাশ নিয়ে যাবেন গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটে। সেখানে অথবা নওগাঁর শ্বশুরবাড়ি এলাকায় দাফন করা হবে তাকে। এর আগে গতকাল জোহরের নামাজের পর আবহাওয়া অধিদপ্তর অফিসে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা শাপলার ডায়াবেটিসও বেড়ে গিয়েছিল। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। ডেঙ্গুর শেষ পর্যায় হওয়ায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও শুরু হয়। ফলে অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি তাকে।

শাপলার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম উজ্জ্বল বলেন, 'কী দুর্ভাগ্য আমাদের! বোনকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অনাগত ভাগ্নিকেও হারালাম। মা-হারা হলো সাত বছরের ছেলেটা। ওর (শাপলা) স্বামী কীভাবে এই শোক সামাল দেবে! আমরাই বা কীভাবে ওকে সান্ত্বনা দেব! আমরা নিজেরাই তো একটা ঘোরের মধ্যে আছি। মাত্র তিন দিনের মধ্যে পুরো পরিবারটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। আবার ছোট ভাই জুয়েলও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ওর চিকিৎসা চলছে। আল্লাহ জানেন ওর কী হবে।'

পারিবারিক সূত্র জানায়, নয় বছর আগে নওগাঁর বদলগাছীর বাসিন্দা নাজমুল হকের সঙ্গে শাপলার বিয়ে হয়। তাদের সন্তান শাকিব ঢাকার শেরেবাংলা নগরের একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্র।

এর আগে রোববার সকালে রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মারা যান পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শাহাবুদ্দীন কোরেশীর স্ত্রী সৈয়দা আক্তার। তখন তার স্বামী পেশাগত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।