বরিশাল বিভাগ

বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত ২৭ চিকিৎসক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

পর্যটকসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কুয়াকাটায় ২০১১ সালে ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করা হয়। হাসপাতাল উদ্বোধনের আগেই সেখানে পদায়ন করা হয়েছিল ডা. আফরোজা আক্তার নামের এক চিকিৎসককে। উদ্বোধনের কয়েকদিন পর তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ছুটি নেন। তারপর আট বছর পেরিয়ে গেলেও কর্মস্থ্থলে ফেরেননি ডা. আফরোজা। তিনি কোথায় আছেন, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ কিছু জানে না। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তার জায়গায় নতুন চিকিৎসকও পদায়ন করা যায়নি।

ডা. আফরোজার মতো বরিশাল বিভাগে  আরও ২৬ জন চিকিৎসক বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত। উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ গমনসহ নানা কারণ দেখিয়ে ছুটি নেওয়ার পর আর কর্মস্থলে যোগ দেননি এসব চিকিৎসক। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও জানেন না স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ছুটি নিয়ে লাপাত্তা হওয়া এ চিকিৎসকরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্বরত ছিলেন। লাপাত্তা হওয়ার দশক পেরিয়ে গেলেও তারা চাকরিচ্যুত হননি। এ কারণে তাদের জায়গায় নতুন চিকিৎসকও পদায়ন করা যায়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী। এসব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আহসান কবিরের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২৭ জন চিকিৎসক বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এর মধ্যে ২০০০ সাল থেকে অনুপস্থিত বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ আন্ধারমানিক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম, ২০০৮ সাল থেকে বরগুনা জেলার সদর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. শামীমা পারভীন, আমতলী উপজেলা হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিস্ট ডা. ইয়াসির আলম, ২০১০ সাল থেকে অনুপস্থিত হিজলার হরিনাথপুর উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. সরদার মো. তানভীর, গৌরনদী উপজেলার বার্থি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. তাপস কুমার, ২০১১ সাল থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আবু বক্কর সিদ্দিক, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আফরোজা আক্তার, চরফ্যাসন উপজেলা হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. এএফএস তাজুল ইসলাম, আমতলী উপজেলা হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট ডা. মাকসুদা আক্তার, ২০১২ সাল থেকে বরিশালের হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. তারিক আলম, ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ইমতিয়াজ আহম্মেদ ও সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ১০ শয্যা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তৌফিকুল ইসলাম, ২০১৩ সাল থেকে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. শারমিন সুলতানা, ভোলার লালমোহন উপজেলার কর্তারহাট উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. শামীম আহম্মেদ, ২০১৪ সাল থেকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চামটা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. মুসফেক উল সালেহিন ও নলুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. তাসনুভা ফারুক, ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. খাদিজা নাসরিন ও সহকারী সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান, ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. প্রজ্ঞা পারমিতা মণ্ডল, ২০১৫ সাল থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার সোমা হালদার, ২০১৬ সাল থেকে বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. মো. নাইম হাসান, ২০১৭ সাল থেকে বরিশালের মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. প্রসেনজিৎ সাহা, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. নাজমুল হাসান, পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলার মহিষকাটা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. কুদরত এহসান ও উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সোহানা আফরোজ সাইদা এবং ২০১৮ সাল থেকে অনুপস্থিত পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. শিকদার মাহমুদ হোসেন ও বরগুনা বালিয়াতলী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন ডা. সৈয়দ ইমরান আহম্মেদ।

কুয়াকাটা ২০ শয্যা হাসপাতালে অনুপস্থিত ডা. আফরোজা সম্পর্কে জানতে চাইলে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. চিন্ময় দাস বলেন, তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখভাল করছেন।

হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডা. চিন্ময় বলেন, পাঁচজনের জায়গায় বর্তমানে দু'জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জন্মলগ্ন থেকে এ হাসপাতালটিতে কখনোই দু'জনের বেশি চিকিৎসক পদায়ন হয়নি। চিকিৎসাসেবা হয় নামমাত্র।

আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, তার উপজেলায় ডা. মো. আবুবকর সিদ্দিক ও ডা.সোমা হালদারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সোমা ছয় মাসের ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। অন্যজন ছুটিই নেননি। তাদের ঠিকানায় একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে।

হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মামুন অর রশিদ বলেন, এ উপজেলায় যোগদানের পর থেকে ডা. তারিক আনাম অনি কর্মস্থলে আসছেন না। তিনি সম্ভবত বিদেশে রয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, এ জেলায় ১০ জন চিকিৎসক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিনা অনুমতিতে বছরের পর বছর চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকা প্রসঙ্গে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আব্দুর রহিম বলেন, অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।