হালদা

জেলেরা অপেক্ষায় ডিম উৎসবের

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

সারোয়ার সুমন ও মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম

জেলেরা অপেক্ষায় ডিম উৎসবের

হালদা নদীর তীরে ডিম থেকে রেণু ফোটার জন্য মাটির কুয়া তৈরি করছেন ডিম আহরণকারীরা। ছবিটি অঙ্কুরিঘোনা এলাকার - সমকাল

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও মেঘের গর্জন- এই তিনের সমন্বয়কে হালদাপাড়ের জেলেরা তিথি বলে থাকেন। আর তিথি আসা মানে হালদাপাড়ে ডিম উৎসব শুরু হওয়া। পাঁচ শতাধিক নৌকা নিয়ে সহস্রাধিক জেলে আছেন সেই অপেক্ষায়। এরই মধ্যে ডিম রাখার জন্য দুই পদ্ধতিতে চার শতাধিক কুয়া প্রস্তুত করে রেখেছেন তারা। প্রস্তুত করা হয়েছে ডিম থেকে রেণু ফোটানোর পাত্রও। জেলেদের প্রত্যাশা- রুই, কার্প, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ জাতীয় মা মাছ থেকে এবার সর্বোচ্চ পরিমাণে ডিম পাওয়া যাবে। ডিম থেকে ফোটানো রেণু এবার বিক্রিও করা যাবে সর্বোচ্চ দরে। কারণ দীর্ঘদিন নষ্ট হয়ে থাকা অর্ধশত কুয়া এবার পৌনে চার লাখ টাকায় সংস্কার করেছে প্রশাসন। ডিম থেকে রেণু ফোটানোর পাত্রও এবার সংস্কার করা হয়েছে আগেভাগে।

দক্ষিণ এশিয়ায় হালদাই একমাত্র নদী, যেখানে মা মাছ এই মৌসুমে এখানে ডিম ছাড়তে আসে। সংগৃহীত এই ডিম ১৮ থেকে ২২ ঘণ্টার মধ্যে রেণু হয়। এরপর প্রতি কেজি রেণু ৪০ হাজার থেকে লাখ টাকায় বিক্রি করেন জেলেরা।

হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যানুযায়ী গত বছর হালদা থেকে ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করেন জেলেরা। এসব ডিম থেকে পাওয়া যায় ৩৭৮ কেজি রেণু। আর এ রেণু বিক্রি করে জেলেরা আয় করেন প্রায় ১৫ কোটি টাকা। হালদা নদীর রেণু গুণগত মানের দিক থেকে সেরা। অন্য কোনো উৎসের রেণু বছরে সর্বোচ্চ ১ কেজি পর্যন্ত বড় হলেও হালদার রেণু বড় হয় এর তিনগুণ বেশি। এ জন্য হালদার রেণুর চাহিদা বেশি, দামও বেশি।

হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও মেঘের গর্জন একসঙ্গে হওয়ায় প্রতি বছর এ মৌসুমে হালদায় ডিম ছাড়তে আসে মা মাছ। ডিম ছাড়ার এ বিশেষ সময়কে আমরা বলি তিথি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ তিথি আসবে বলে ধারণা করছি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা যায়, হালদা নদীতে মা মাছ ২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল ডিম ছাড়ে। একইভাবে ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল, ২০১৬ সালে ২ মে, ২০১৫ সালে ২১ এপ্রিল ও ১২ জুন মা মাছ ডিম ছাড়ে। টানা বৃষ্টির

সঙ্গে মেঘের গর্জন এক হলেই বিভিন্ন স্থান থেকে মা মাছ ডিম ছাড়তে আসে হালদা নদীতে। হালদা থেকে জেলেরা ডিম সংগ্রহ করলেও সব মৌসুমেই তাদের মুখে হাসি ছিল না। কারণ, এক বছর ভালো সংগ্রহ হলে আরেক বছর হয়েছে খারাপ।

হালদা নদীর জেলে উদয়ন বড়ূয়া বলেন, অঙ্কুরি ঘোনা, গড়দুয়ারা, আজিমের ঘাট, সত্তারঘাট এলাকায় রাতে অনেকে জাল ফেলে মা মাছ নিধন করছে। এসব কারণে কমে যাচ্ছে ডিম ছাড়ার হার। এবার শতাধিক কুয়া আগেভাগে সংস্কার হওয়ায় বেশি রেণু পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

হালদাপাড়ে সরেজমিন গিয়ে এবার ডিম আহরণকারীদের আগাম প্রস্তুতি দেখা গেছে। ডিম থেকে রেণু ফোটাতে কেউ কেউ নদীতীরে মাটির কুয়া তৈরি করছেন। সাধারণত এ ধরনের কুয়া দৈর্ঘ্যে ১৫ ফুট ও প্রস্থে ১০ ফুট। আবার সরকারিভাবে কংক্রিট দিয়ে চারকোণার কিছু কুয়া তৈরি করে দেওয়া হয়েছে জেলেদের। হাটহাজারী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আজহরুল আলম জানান, রাউজান উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে দেড় শতাধিক মাটির কুয়া প্রস্তুত আছে। সরকারি তিনটি হ্যাচারিতে ৮৯টির মধ্যে প্রায় ৬০টি কুয়া প্রস্তুত করা হয়েছে। আর হাটহাজারী অংশে ৬০টি মাটির কুয়ার পাশাপাশি তিনট হ্যাচারিতে ১১৮টি কুয়া ডিম রাখার জন্য প্রস্তুত আছে। সব মিলিয়ে ৪১৭টির মতো কুয়া ডিম রাখার কাজে ব্যবহূত হতে পারে এবার।

হাটহাজারীর ইউএনও রুহুল আমিন বলেন, নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে গত ৭ মাসে ৩৭টি অভিযান পরিচালনা করে ১ লাখ মিটার জাল জব্দ ও পাঁচটি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য এবার ডিম ও রেণু বেশি হওয়ার আশা করা হচ্ছে।