আদালতে স্বামীর জবানবন্দি

বিদেশে যেতে চাওয়াই কাল হলো হাসির

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০১৯     আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৯

ইন্দ্রজিৎ সরকার

বিদেশে যেতে চাওয়াই কাল হলো হাসির

নিহত হাসি বেগম

মালয়েশিয়ায় ছয় মাস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে বছরখানেক আগে দেশে ফেরেন হাসি বেগম। সম্প্রতি তিনি আবারও বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তার স্বামী কমল হোসেন এতে রাজি ছিলেন না। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা চরমে উঠেছিল। এর একপর্যায়ে বুধবার ভোরে কমল প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। গলা টিপে হত্যা করেন স্ত্রীকে। এরপর কেরোসিন ঢেলে লাশটি পুড়িয়ে ফেলারও চেষ্টা চালান। গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এমন বর্ণনা দিয়েছেন কমল।

মুগদা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা সমকালকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর বুধবারই লেদ কারখানার মালিক কমল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে তিনি হত্যার নেপথ্যের কারণও উল্লেখ করেছেন। জবানবন্দি রেকর্ডের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বুধবার রাজধানীর দক্ষিণ মুগদার ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসায় হাসি বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর হত্যার আলামত লুকাতে মৃতদেহে আগুন ধরিয়ে দেন কমল। ওই সময় ঘরের বাইরে গিয়ে 'আগুন-আগুন' বলে চিৎকার করে তিনি সবাইকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও চালান। এ ঘটনায় হাসির বাবা শেখ আলতাব বাদী হয়ে কমলকে আসামি করে মুগদা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, আট মাস আগে কমল ও হাসির বিয়ে হয়। এটি দু'জনেরই দ্বিতীয় বিয়ে। তাদের আগের পক্ষের সন্তানও রয়েছে। কমলের সন্দেহ, আগের স্বামীর সঙ্গে হাসির যোগাযোগ ছিল। তাদের মধ্যে নিয়মিত কথা হতো। তবে কমল জানতে চাইলে হাসি তা অস্বীকার করতেন। এসব নিয়ে মনোমালিন্য তৈরি হলে বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন হাসি। কমলের ধারণা ছিল, বিদেশে গেলে স্ত্রী তার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না। তাই তিনি কড়া ভাষায় বিদেশে যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু হাসি তার কথায় গুরুত্ব দেননি। এতে তিনি আরও বেশি ক্ষিপ্ত হন। তবে তার দাবি, হত্যার কোনো উদ্দেশ্য বা পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি এমনটা ঘটিয়েছেন। যখন বুঝতে পারেন হাসি মারা গেছে, তখন তিনি বাঁচার উপায় খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে হত্যাকে অগ্নিকাণ্ড বা শরীরে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা হিসেবে চালানোর চিন্তা করেন। সে অনুযায়ী তিনি স্ত্রীর মৃতদেহে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। একই সঙ্গে তার আত্মহত্যার পরিকল্পনা ছিল বলেও দাবি করেন কমল।

নিহত তরুণীর মা আলাপী বেগম জানান, প্রথম স্বামীর সংসারে হাসির একটি ছেলে রয়েছে। তার বয়স আট বছর। দ্বিতীয় বিয়ে করায় এই ছেলেটির ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন হাসি। কারণ তার সাবেক স্বামী সন্তানের বিষয়ে মনোযোগী নন। অভাবের সংসারে ছেলেটি যত্নও পেত না। এ কারণে হয়তো ফোনে ছেলের খোঁজ-খবর নিয়ে থাকতে পারেন হাসি। কিন্তু সাবেক স্বামীর সঙ্গে তার অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাহলে তাকে তালাক দিয়ে কমলকে বিয়ে করতেন না।

এর আগে আলাপী বেগম অভিযোগ করেন, জামাতা কমল হোসেন তার কাছে তিন লাখ টাকা যৌতুক চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের পক্ষে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া আগের পক্ষের ছেলের জন্য কমলের কাছে ১০ লাখ টাকা চেয়েছিলেন হাসি। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয়েছিল। এসব ঘটনার জের ধরেই হাসিকে হত্যা করা হয়।