মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

অবশেষে সংরক্ষণ হচ্ছে 'এমভি একরাম'

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭      

এমএ খান মিঠু, নারায়ণগঞ্জ


১৯৭১ সালের ৩০ অক্টোবর। চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীর লন্ডন ঘাটে এসে নোঙর করে পাকিস্তানি হানাদারদের রসদবাহী জাহাজ 'এমভি একরাম'। জাহাজটিতে তাদের জন্য অস্ত্র ও খাবার ছিল। শত্রুপক্ষকে দুর্বল করে দিতে জাহাজটি ডুবিয়ে দিতে মুক্তিবাহিনীর নৌ কমান্ডো ইউনিটের একটি গ্রুপ একত্রিত হয়। ওই রাতেই ডিনামাইট বিস্ম্ফোরণে জাহাজটি ডুবিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের নৌ কমান্ডো গ্রুপ। সেদিনের হামলায় চাঁদপুরে অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদাররা। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের জানান দেন।
নৌ কমান্ডোদের ওই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের পর 'বীরপ্রতীক' খেতাবপ্রাপ্ত হন। মুক্তিযোদ্ধারা 'এমভি একরাম' ডুবিয়ে দেওয়ার ৩৭ বছর পর ২০০৮ সালের ৯ অক্টোবর ডাকাতিয়া নদীর তলদেশ থেকে উদ্ধার করা হয় জাহাজটি। উদ্ধারের পর ওই সময় চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা, বিভিম্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জাহাজটিকে মুক্তিযুদ্ধের স্ট্মৃতি হিসেবে চাঁদপুরেই সংরক্ষণের দাবি ওঠে। সে দাবিকে উপেক্ষা করেই ২০০৮ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে 'এমভি একরাম'কে গোপনে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসা হয় স্ট্ক্র্যাব হিসেবে বিক্রির জন্য। ওই সময় ক্ষোভে ফেটে পড়েন চাঁদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। 'এমভি একরাম'কে স্ট্ক্র্যাব হিসেবে বিক্রির পরিবর্তে সেটিকে মুক্তিযুদ্ধের স্ট্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জোরালো হয়। ওই সময় চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারাও। ফলে 'এমভি একরাম'কে তখন আর স্ট্ক্র্যাব হিসেবে বিক্রি করতে পারেনি স্বার্থাল্প্বেষী মহল।
নদীর তলদেশ থেকে উত্তোলনের দীর্ঘ ৯ বছর পর অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের স্ট্মৃতিবিজড়িত হিসেবে 'এমভি একরাম'কে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। জাহাজটি সংরক্ষণে এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জাহাজটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে শীতলক্ষ্যা নদীর সোনাকান্দা শাহেন শাহ ডকইয়ার্ড থেকে কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডে নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন অযত্মম্ন-অবহেলায় নদীতীরে অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় পড়ে থাকায় জাহাজটির অবস্থা এখন অনেকটাই নাজুক।
বিআইড্িব্নউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বালু ব্যবসায়ী মোক্তার হোসেন, মনির হোসেন, সানোয়ার হোসেন, মফিজুল ইসলাম ও আবদুল করিম যৌথভাবে শিল্প ব্যাংক থেকে নিলামে ২০০৮ সালে চাঁদপুরের লন্ডন ঘাটে নিমজ্জিত 'এমভি একরাম' নামে কার্গো জাহাজটি স্ট্ক্র্যাব হিসেবে কিনে নেন। এর পর ওই বছরের ৯ অক্টোবর ডাকাতিয়া
নদীর তলদেশ থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর কার্গো জাহাজটিকে উত্তোলন করা সম্ভব হয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার বিআইড্িব্নউটিএ সরকারিভাবে এবং কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জাহাজটিকে উত্তোলনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে ওই বছরের ১৩ অক্টোবর রাতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ডাকাতিয়া নদীর লন্ডন ঘাট থেকে জাহাজটি উত্তোলন করে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সোনাকান্দায় শীতলক্ষ্যাতীরে বিএনপি নেতা শাহেন শাহর মালিকানাধীন ডকইয়ার্ডে এনে রাখা হয় কেটে বিক্রি করার জন্য। ওই সময় এ ঘটনার বিরোধিতা করে চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন করেন এবং জাহাজটি রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের সহায়তা কামনা করেন।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা এই জাহাজে করে তাদের রসদ বহন করত। জাহাজটি ১৯৬৫ সালে হল্যান্ডের রটারন্ডের রটারডাম বন্দরে নির্মিত হয়। ইউনাইটেড ট্রেডিং করপোরেশন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংক অব পাকিস্তান জাহাজটির মালিকানায় ছিল। স্বাধীনতার পর এটি তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের অধীনে চলে যায়। তবে উত্তোলনের আগে এটিকে স্ট্ক্র্যাব হিসেবে নিলামে বিক্রি করে দেয় শিল্প ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। জাহাজটি নদীর তলদেশ থেকে উত্তোলনের পর মুক্তিযুদ্ধের স্ট্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে দাবি উঠলে ২০০৯ সালের ১৭ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর থেকে জাহাজটি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরে শাহেন শাহর ডকইয়ার্ডে রক্ষিত ছিল।
চলতি বছরের ২৯ জুন বন্দরের নূরে আলম ও জসিম নামে দুই ব্যক্তি জাহাজটি আবারও কাটা শুরু করে। গত ৫ জুলাই মোক্তার হোসেন নামের এক মুক্তিযোদ্ধা বন্দর থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ গিয়ে জাহাজ কাটা বন্ধ করে দেয়।
নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, 'জাহাজটি যেন কেউ কেটে নিতে না পারে, সে জন্য প্রতিদিন দুই ভাগে পুলিশ পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে জাহাজটির যেসব অংশ চুরি হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।'
বিআইড্িব্নউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. গুলজার আলী বলেন, 'সরকারিভাবে জাহাজটি সংস্কারের জন্য নির্দেশ রয়েছে। তাই এর ভেতরের পানি সেঁচে কমানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে জাহাজটি নতুন করে সংস্কার করার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডে। সেখানে সব কাজ শেষ হলে সংরক্ষণ করা হবে জাহাজটি।'
মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী বীরপ্রতীক যা বললেন
জাহাজটিকে নিয়ে স্ট্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌ কমান্ডো ইউনিটের প্রধান এবং '৭১ সালের ৩০ অক্টোবর 'এমভি একরাম' ডুবিয়ে দেওয়ার অভিযানে নেতৃত্বে দেওয়া মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী বীরপ্রতীক বলেন, সেদিন তিনিসহ তিনজন জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিতে জাহাজের কাছে গিয়েছিলেন। অপর দুই সঙ্গী হলেন মুক্তিযোদ্ধা ও নৌ কমান্ডো ইউনিটের সদস্য আবদুল হাকিম ও ফজলুল কবীর। তাদের তিনজনকে পেছন থেকে নিরাপত্তা দিতে অংশ নিয়েছিলেন আরও ১০-১২ জন মুক্তিযোদ্ধা।
'এমভি একরাম' সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। সেই হিসেবে নৌ কমান্ডোদের সফলতার চিহ্ন হিসেবে এটি সংরক্ষিত থাকবে। তিনি সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বলেন, যেহেতু এটি নৌ কমান্ডোদের একটি বিশাল সফলতা, তাই এটিকে হয় চাঁদপুরে নয়তো ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক, যেন সমগ্র জাতি এটিকে দেখে মুক্তিযোদ্ধা বিশেষ করে নৌ কমান্ডোদের সফলতা সম্পর্কে জানতে পরে।