ভোটের হাওয়া: পিরোজপুর-২

জেপির দুর্গে হানা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আ'লীগ-বিএনপি

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭      

এসএম রিয়াজ মাহমুদ মিঠু ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)


ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও ইন্দুরকানী- এ তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-২ আসন। এ আসনের ভোটার দুই লাখ ১০ হাজার ৯৯৭। এর মধ্যে ভান্ডারিয়ায় এক লাখ তিন হাজার ৬৪৮, ইন্দুরকানীতে ৫৪ হাজার ২৪৬ ও কাউখালীতে ৫৩ হাজার ১০৩ জন। এ আসন জাতীয় পার্টির (জেপি) দুর্গ হিসেবে পরিচিত। এ আসনে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালের ছয়টি নির্বাচনে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তিনি চারবার মন্ত্রী ছিলেন। কোনো এক ব্যক্তির এতবার মন্ত্রী হওয়া বিরল ঘটনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন হলে পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও ইন্দুরকানী) আসনে মহাজোট থেকে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রার্থী হবেন- এমন ধারণা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এলাকায় গত ৩০ বছর ধরে ব্যাপক উম্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ায় এ আসনে তার বিজয় নিয়ে কারও মনে
\হসন্দেহ নেই। তিনি সুখে-দুঃখে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ান বলে ভোটাররা তার প্রতি দুর্বল। তার দুর্গে ফাটল ধরানোর মতো কোনো দলের শক্ত প্রার্থী নেই।
১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের হলে ২০০৮ সালের নির্বাচন করতে পারেননি তিনি। ওই নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আসনবিন্যাসে ভান্ডারিয়া-কাউখালী নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে নেছারাবাদকে যুক্ত করা হয়। এ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রার্থী হতে না পারায় মহাজোট মনোনীত প্রার্থী নেছারাবাদ উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম নির্বাচিত হন। তার নিকটতম চারদলীয় জোট প্রার্থী নূরুল ইসলাম মঞ্জু হেরে যান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেছারাবাদ) নির্বাচনী এলাকার আবার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সে সময় পিরোজপুর-২ আসন থেকে নেছারাবাদ উপজেলাকে বাদ দিয়ে ভান্ডারিয়া-কাউখালী উপজেলার সঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলাকে যুক্ত করা হয়। ওই নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী ইসাহাক আলী খান পাম্না তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন।
আগামী নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে মহাজোটের সঙ্গে জেপির ঐক্য বজায় থাকলে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে আসন ভাগাভাগিতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুই প্রার্থী মনোনীত হবেন। এতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী।
এদিকে জেপির দুর্গে হানা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জোট-মহাজোটসহ বিভিম্ন দলের এক ডজন প্রার্থী। গ্রুপিং ভুলে ঘর গোছাতে তৎপর এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এদিকে, একক নেতৃত্বে মাঠে রয়েছেন জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। উপজেলা পর্যায়ে জেপির কমিটি থাকলেও ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। এ নিয়ে জেপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মনে করেন, 'রাজনীতি বড় কথা নয়', ঐক্যবদ্ধ হয়ে এলাকার উম্নয়ন করাই তার দলের মুখ্য উদ্দেশ্য। তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি থাকলে এলাকার বিভিম্ন কর্মকান্ডে দলীয় প্রভাব পড়ে, এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণম্ন হয়। মঞ্জু ব্যাপক উম্নয়ন করায় এলাকায় তার বড় ভোটব্যাংক সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচনে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট এম এ হাকিম, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কাউখালী উপজেলার বাসিন্দা ইসাহাক আলী খান পাম্না, বাংলাদেশ আওয়ামী সমবায় লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ভান্ডারিয়া পৌর শহরের বাসিন্দা মো. আমিনুর রশিদ ছগির জোমাদ্দার, পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান, ভান্ডারিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মিরাজুল ইসলাম মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা যায়।
পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম হাওলাদার ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবারের নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী মঞ্জুই হবেন বলে তার ধারণা। তবে নেত্রী তাকে যে আসনে মনোনয়ন দেবেন, সেখানেই তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী।
আমিনুর রহমান ছগির আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে পরিচিত। তার চাচাতো ভাই ফায়জুর রশিদ খসরু ভান্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তার নানা আবদুল মজিদ হাওলাদার মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ছগির প্রার্থী হওয়া নিয়ে তার সমর্থকরা যথেষ্ট আশাবাদী।
২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সহ-সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল কবির লাবু। তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সহসভাপতি। তিনি ছাত্রদলের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি প্রায় ৩০ বছর চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত। তিনি ভান্ডারিয়া উপজেলার দক্ষিণ শিয়ালকাঠি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী তালুকদার বাড়ির মৃত আশ্রাব আলী তালুকদারের ছেলে। তারা যুগ যুগ ধরে জনপ্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। তার বড় ভাই শফিকুল কবির বাবুল নদমুলা-শিয়ালকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং ছোট ভাই জেপি নেতা ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। দলের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
কাউখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম আহসান কবির দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও অন্য দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক বেশ ভালো। জেলা বিএনপিতেও তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। দলের মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
এদিকে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর পুত্র ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এর আগে মঞ্জুর সুমনের বাবা নূরুল ইসলাম মঞ্জুর পরপর তিনবার চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়ে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মূলত বাবার উত্তরসূরি হিসেবে এ আসনে তিনি মনোনয়ন চাইবেন। তবে আজ থেকে ১১ বছর আগে ২০০৫ সালে তাকে ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এর পর থেকে তিনি ব্যবসায়ী কাজে সপরিবারে রাজধানীতে বসবাস করেন।
পিরোজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা গাজী নূরুজ্জামান বাবুল এ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি দলীয় এবং সামাজিক কর্মকান্ডে প্রায়ই এলাকায় যান এবং সাধারণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তিনি ১৯৭৩ সালে ভাসানী-ন্যাপের মনোনয়ন নিয়ে ভান্ডারিয়া-কাঁঠালিয়া থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রবীণ এ নেতা ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করেছেন। একবার তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কাউখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহসান কবির দলের কাছে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ১/১১ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়নি এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিম্ন ব্যক্তিরা যাতে মনোনয়ন না পায় সেদিকে দলের নীতিনির্ধারণী মহলকে দৃষ্টি দিতে হবে। তার মতে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ডা. রফিকুল কবির লাবু দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষাসহ দল গোছানোর কাজ করছেন। তাই এ আসনে তিনি একজন যোগ্য প্রার্থী।
এদিকে, নির্বাচনী এলাকা ভান্ডারিয়া-কাউখালীর সঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলা যুক্ত হওয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র বর্তমান ইন্দুরকানী উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী এবং তার ভাই শামীম সাঈদীর নামও প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে। তবে এ আসনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তাদের অবস্থান অনেকটা শক্ত।
জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাকে জেল খাটতেও হয়েছে। তিনি বলেছেন, জোটের কাছে তিনি পিরোজপুর-২ আসনে মনোনয়ন চাইবেন। তার গ্রামের বাড়ি ভান্ডারিয়া উপজেলার ভিটাবাড়িয়া গ্রামে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি পিরোজপুর জেলার প্রধান সংগঠক ও বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভান্ডারিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খান মো. রুস্তুম আলী ১৯৯৬ সালে বামফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে হাতুড়ি মার্কা নিয়ে পিরোজপুর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মহাজোটের অন্যতম শরিক দল হিসেবে এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন।