ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে প্রাণ গেল ভার্সিটি ছাত্রের

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭      

সমকাল প্রতিবেদক


বাসা থেকে আনুমানিক ১০০ গজ দূরত্বে তিন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন খন্দকার আবু তালহা (২২)। এই তরুণের দামি মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় তারা। এর পরপরই একই এলাকার দুই ভাইবোনের কাছ থেকে ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ছিনতাইকারীরা। এ সময় আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি তরুণ তালহা। প্রতিরোধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। জাপটে ধরেন এক ছিনতাইকারীকে। কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মেধাবী এ তরুণ। নিহত তালহা কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহির ভাঘ্নে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতা দেখানোর এ ঘটনা ঘটেছে গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর টিকাটুলীর কেএম দাস লেনে। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুলিয়া শাখার কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তালহা গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। এ সময় ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে জীবন হারাতে হয় তাকে।
আবু তালহার বাবা নূরউদ্দিন খন্দকার সমকালকে জানান, বাসা থেকে আনুমানিক ১০০ গজ দূরেই তার ছেলে
ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতের শিকার হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় সে সেখান থেকে বাসায় গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয় এবং 'আব্বু' বলে চিৎকার করে। দরজা খুলেই তিনি রক্তাক্ত ছেলেকে দেখতে পান। তাকে নিয়ে রওনা হন হাসপাতালের দিকে। পথে বেশ কয়েকবার 'আব্বু' বলে ডাক দেয় তালহা। তবে ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে সে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তালহাকে। কাম্নাজড়িত কণ্ঠে নূরউদ্দিন বলেন, 'আমার ছেলে শেষবারের মতো কয়েকবার আব্বু বলে ডেকেছিল। বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না তাকে। আমার হাতের ওপর থেকেই চলে গেল সে।' কথাগুলো বলেই কেঁদে ফেলেন সন্তানহারা বাবা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তালহার মৃতু্য হয়েছে।
এর আগেও টিকাটুলীর কেএম দাস লেনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর এখানে রিকশা আটকে ছিনতাইয়ের সময় স্বপন নামের এক রিকশাচালক আহত হন। পরে এলাকাবাসীর পিটুনিতে নাদিম নামের এক ছিনতাইকারীর মৃতু্য হয়। একই এলাকায় একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশের শিথিলতায় ক্ষুব্ধ এ এলাকার অধিবাসীরা।
তালহার স্বজনরা জানান, তালহার বাবা নূরউদ্দিন একজন ব্যবসায়ী। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার কাদবাদেওরা গ্রামে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে ওয়ারীর কেএম দাস লেনে থাকেন তিনি। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তালহা বড়। আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকতেন তিনি। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় প্রতি বৃহস্পতিবার বাসায় চলে আসতেন, ছুটি কাটিয়ে শনিবার সকালে চলে যেতেন। এবারও গত বৃহস্পতিবার বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। তবে অসুস্থ থাকায় শনিবার আর আশুলিয়ায় যাওয়া হয়নি। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তালহা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে রিকশায় ওঠেন। ১০০ গজ সামনে এগোতেই দুই ছিনতাইকারী ছুরি দেখিয়ে রিকশার গতিরোধ করে। আরও এক ছিনতাইকারী তাদের সঙ্গে ছিল। তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় তিন ছিনতাইকারী। এরপরই পেছনের রিকশা থামায় তারা। ওই রিকশায় একই এলাকার দুই ভাইবোন সানি ও সাদিয়া ছিলেন।
সানি সমকালকে জানান, ছিনতাইকারীরা তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তালহা রাস্তার পাশ থেকে ইট নিয়ে ছুড়ে মারে এবং 'ধর ধর' বলে চিৎকার করতে থাকে। এ সময় সানিও চিৎকার করে। তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে ছিনতাইকারীরা। তাদের একজনকে তালহা জাপটে ধরে। এ সময় তার ডান হাতে ও ডান পায়ের ঊরুতে ছুরিকাঘাত করে দৌড় দেয় সে। ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে করতে সানিও 'ধর ধর, ছিনতাইকারী ধর' বলে চিৎকার করতে থাকেন। সানি বলেন, রাস্তায় মানুষ থাকলেও ছিনতাইকারীদের ধরতে কেউ এগিয়ে আসেনি। তিনি প্রায় আধা কিলোমিটার ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করেছিলেন।
এদিকে, রক্তাক্ত তালহাকে নিয়ে তার বাবা প্রথমে একটি রিকশায় ওঠেন। খানিকটা সামনে এসে তিনি সিএনজি অটোরিকশা পেলে তাতে ওঠেন। পথে একটি হাসপাতালে তালহাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর লাশ নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। সেখানে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। বিকেলে স্থানীয় মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি সমকালকে জানান, ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে তার ভাঘ্নে তালহা নিহত হয়েছে। এ সময় অনেকে দেখলেও ছিনতাই প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেনি। মানুষকে সচেতন হতে হবে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এগিয়ে এসে প্রতিহত করতে হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রতিটি এলাকায় কাউন্সিলরদের মাধ্যমে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে ছিনতাইকারীরা আতঙ্কে থাকবে। অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার হাবিব কাজল সমকালকে বলেন, তালহা মেধাবী ছাত্র ছিল। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার পরীক্ষায়ও তালহার ভালো রেজাল্ট ছিল বলে জানান তিনি।
ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে ঘটনার পরপরই পুলিশ ছিনতাইকারী শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে মাঠে নামে। খুব শিগগির ছিনতাইকারীরা ধরা পড়বে বলে আশাবাদী তিনি।