বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পগুলোর মধ্যে সর্বপ্রাচীন ও বৃহত্তম শিল্প হলো তাঁত। এদেশে তাঁতশিল্পের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। সপ্তম শতকের চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাং (হুয়ানসাং) ও ত্রয়োদশ শতকের মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনিতে বাংলার বস্ত্র ও তাঁতশিল্পের উল্লেখ রয়েছে। কুটির শিল্প হিসেবে হস্তচালিত তাঁতশিল্প ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বকালে কেবল দেশেই নয়, বহির্বাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিল। বংশপরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বয়ন উৎকর্ষে তাঁতিরা সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য নিদর্শন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তাঁত শুমারি-২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে তাঁতসংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ২৮২। এর মধ্যে সক্রিয় তাঁত রয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭২৩টি। অন্যদিকে ২০০৩ সালের শুমারিতে তাঁত ছিল ৫ লাখ ৫ হাজার ৫৫৬টি। এর মধ্যে সক্রিয় ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার ৮৫১টি। এরও আগে ১৯৯০ সালের শুমারিতে তাঁত ছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৬টি এবং সক্রিয় তাঁত ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ২১৩টি। তাঁত শুমারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৩ লাখ ১৬ হাজার ৩১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৫ ও নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৭০ জন। এর আগে ২০০৩ সালের শুমারিতে এ শিল্প খাতে নিয়োজিত জনবল ছিল ৮ লাখ ৮৮ হাজার ১১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৭ জন, নারী ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৮ জন। এরও আগে, ১৯৯০ সালের শুমারির তথ্য অনুযায়ী, তাঁতশিল্পে যুক্ত ছিলেন ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৭১ হাজার ৭৬৫ জন, নারী ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৪২ জন। ২০০৩ থেকে '১৮ সালের মধ্যে দেশে হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি। শতাংশের হিসাবে এই দেড় দশক সময়ে তাঁত কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। একই সময়ে তাঁতশিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমেছে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৮০০। শতাংশের হিসাবে তা প্রায় ৬৪ শতাংশ।

কালের বিবর্তনে এভাবেই তিলে তিলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাচীন হস্তনির্ভর দেশীয় তাঁতশিল্প। আমদানিকৃত রকমারি কাপড়ের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণেও দেশীয় হস্তচালিত তাঁতশিল্পের চাহিদায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে অসম এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা হস্তচালিত তাঁতশিল্পের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যবসায় পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। আরও প্রয়োজন তাঁতশিল্প সম্প্র্রসারণে অপেক্ষাকৃত সংরক্ষিত অভ্যন্তরীণ বাজার, অবৈধ বস্ত্রের প্রবেশ রোধ, তাঁতবস্ত্রের উৎকর্ষে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ডিজাইন বহুমুখীকরণ, ঋণ সহযোগিতা, তাঁতপণ্য বাজারজাতকরণ ও বাজার প্রসারে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ। বস্তুত এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আশা করা যায়, তাঁতশিল্প তার হূতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

মন্তব্য করুন