নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোকে বেছে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কঙ্গোর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের সম্ভাব্যতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেবে সরকার। এরই মধ্যে দু'দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। শিগগির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল দেশটি সফর করবে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত

নেওয়া হয়।

সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা যায়, সভায় মিশনের নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মনিরুল ইসলাম বলেন, আফ্রিকার দেশগুলোতে ধাপে ধাপে বহু বাংলাদেশির কর্মসংস্থান করা সম্ভব। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। ইথিওপিয়ার পোশাক শিল্প খাত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করেই বিকশিত হয়েছে। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের জমি উর্বর, সেচ সুবিধা এবং সুপেয় পানির সহজলভ্যতার কারণে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের জন্য একটি আদর্শ স্থান। তাই সেখানে প্রচুর পরিমাণে কৃষিপণ্য উৎপাদন সম্ভব। এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদার জোগান দিয়েও পাশের রুয়ান্ডা ও উগান্ডায় রপ্তানি করা সম্ভব।

সভায় এফবিসিসিআইর সহসভাপতি আমিন হেলালী বলেন, কঙ্গোতে কৃষি, মৎস্য এবং ফলমূল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয়দের মৎস্য আহরণ, জমি ব্যবহার এবং ফলমূল চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা নেই। উর্বর ভূমি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশটিতে জমি ইজারা নেওয়া যেতে পারে। সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে জমি ইজারা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি গুরুত্বারোপ করেন। টেকসই বিনিয়োগ এবং ব্যবসার স্বার্থে ১০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নে এবং সরকার ৯০ শতাংশ প্রণোদনা ঋণের ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ব্যবসায় উৎসাহিত করা উচিত বলে মত দেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি জানান, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা চীনের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে মাঠপর্যায়ে অবদান রাখছে। আফ্রিকার দেশগুলোকেও বাংলাদেশের কৃষি খাতে সাফল্যের অনুরূপ প্রশিক্ষণ ও বৃত্তি দেওয়া যায়।

বাংলাদেশের কয়েকশ কৃষিশস্য প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো আফ্রিকার আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেগুলো কীভাবে আফ্রিকায় রোপণ এবং উৎপাদন করা যায়, সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা যেতে পারে।

এফবিসিসিআই সদস্য মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ হাঁস-মুরগি উৎপাদন ও মৎস্য খাতে বাংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এই খাতে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০-৪০০ ডলার বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে সেসব দেশে হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার উৎপাদন করা সম্ভব। আফ্রিকার দেশগুলোতে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাতেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রতিনিধি বলেন, বিনিয়োগের জন্য ঘানা এবং গাম্বিয়া উৎকৃষ্ট স্থান। গাম্বিয়ায় চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের প্রকল্প গ্রহণ করে সফল হলে পাশের দেশে বিস্তার ঘটানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় কঙ্গোতে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের সম্ভাব্যতা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলকে দেশটিতে সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় দুই-তিন সপ্তাহের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ মডিউল প্রস্তুত করে ফেব্রুয়ারি নাগাদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। প্রশিক্ষণ মডিউলটি সংশ্নিষ্ট দেশে পরবর্তী সময়ে পাঠানো হবে। চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি মডেল খসড়া চুক্তি প্রণয়ন করবে এবং আফ্রিকার সম্ভাব্য দেশগুলোর সঙ্গে তা স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেবে। এফবিসিসিআই, সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ/সংস্থা, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে আফ্রিকায় চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের সম্ভাবনার ওপর একটি সভা আয়োজন করবে। কঙ্গোতে নিয়োজিত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কনটিনজেন্টের মাধ্যমে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদবিষয়ক প্রাসঙ্গিক তথ্য আহরণ করা যেতে পারে।

মন্তব্য করুন