ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ চলছে। খনন করা বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছিল মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণের কাজে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু সেই বালু দেদার চলছে লুট। শুধু স্তূপ করা বালু নয়, ইজারাবিহীন ঘাটে বালু উত্তোলন ও বেচাকেনাও চলছে। প্রকাশ্যে এমন অপতৎপরতা চলায় প্রশ্ন উঠেছে- বালুর 'মধু' কারা খাচ্ছে? স্থানীয়দের দাবি, সব জেনেও বালু লুট বন্ধ করছে না প্রশাসন। এমন অবস্থা চলছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে।

ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ চলায় গেল বছর নদ এলাকায় ইজারা হয়নি কোনো বালুমহাল। জেলার ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচর ও চররামমোহন বালুমহালও ইজারার বাইরে ছিল। সর্বশেষ বালুমহালটি ইজারা ছিল ত্রিশালের বালিপাড়া এলাকার আবুল বাশার নামের এক ব্যক্তির কাছে। কিন্তু ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় বালুখেকোরা শুরু করে অপতৎপরতা। বছরজুড়ে অসাধু চক্র প্রভাব খাটিয়ে বালু উত্তোলন ও বিক্রি চালু করতে চাইলে প্রশাসন কয়েক দফা জেল-জরিমানাও করে। কিন্তু এক মাস ধরে পুনরায় উচাখিলার মরিচারচর টানমলামারি এলাকায় বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছেন মাহাবুল ও হবি মিয়া নামের দুই ব্যক্তি। বটতলা বালুর ঘাট থেকে ভেতরের এলাকাটিতে দেদার বিক্রি হচ্ছে বালু।

প্রকাশ্যে বালু লুট চলছে রাজীবপুর ইউনিয়নের চররামমোহন মৌজার বটতলা বালুর ঘাটে। নৌকা দিয়ে শ্রমিকরা বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। দিনভর বিক্রিও চলছে। বালুমহালটির পাশে সরকারি খাস জমিতে ব্রহ্মপুত্র নদ খনন করা বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। সেই বালু বিক্রি করে দিচ্ছে স্থানীয় চক্রটি। এলাকায় গেলে প্রকাশ্যে বালু লুটের দেখা মেলে। ট্রাক্টর ও ট্রলিভরে বালু যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। নদীতে বাঁধা নৌকা থেকে শ্রমিকরা উপরে তুলছেন বালু।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বন্ধ থাকা বালুমহালটি চালু করতে অন্তত চার লাখ টাকার ফান্ড গঠন করা হয়। পরে জেলার একটি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করে সপ্তাহখানেক আগে চালু করা হয় বালু বিক্রি। ওই ছাত্রনেতা স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও ফোন করেন। তবে বালু লুটে জড়িতদের দাবি, শ্রমিকদের স্বার্থে নৌকা দিয়ে কিছু বালু তোলা হয়। স্তূপ করা বালু ব্যক্তিগত জমিতে হওয়ায় প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই বিক্রি করছেন।

স্তূপ করা বালু সরানো জমির মালিকানা দাবি করেন আক্তারুজ্জামান শরাফত। তিনি রাজীবপুর ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি। উপস্থিত লোকজন ট্রাক্টর দিয়ে বালু বিক্রির সঙ্গে ওই নেতার নাম জানালেও অস্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, মুজিববর্ষের ঘরের মাটি তিনি অন্তত ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ভরে দিয়েছিলেন। তখন ভূমি অফিসের লোকজন তাকে আশ্বাস দিয়েছিল, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ড্রেজিং করা বালু ব্যক্তি-জমিতে থাকলে সেগুলো নিয়ে নিতে। কয়েক দিন আগে এলাকার কয়েকজন এসিল্যান্ডের সঙ্গে দেখা করে ব্যক্তি-জমিতে থাকা বালু সরানোর অনুমতি আনেন। বিষয়টি জানিয়ে রফিকুল ইসলাম নামে তার চাচা বিক্রি শুরু করেছেন। তিনি এর সঙ্গে জড়িত নন। স্থানীয় সাইফুল ইসলামও বালু সিন্ডিকেটের সদস্য। তিনি বলেন, সবকিছু ম্যানেজ করেই তারা কাজ করছেন। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকাশ্যে বালু লুট চললেও প্রশাসন নিশ্চুপ। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বালু লুট করে অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র। দ্রুত অপতৎপরতা বন্ধের দাবি জানান তিনি।

তবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাঈদা পারভীন বলেন, তার কার্যালয়ে গিয়ে ব্যক্তি-জমিতে বালু থাকায় সেগুলো সরিয়ে জমি চাষাবাদের অনুমতি চায়। কিন্তু পরে জানতে পারেন, সরকারি জমিতে থাকা বালু নিয়ে যাচ্ছে। ওই অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পাঠিয়ে বালু সরানো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, তারা বন্ধ করে দেবেন।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, ড্রেজিং করা বালুগুলো মুজিববর্ষের ঘর নির্মাণের কাজে ব্যবহার করার জন্য রাখা হয়েছিল। ব্যক্তির কোনো জমি নেই সেখানে। সরকারি জমিতেই রাখা হয়েছে বালু। কেউ সেগুলো নিতে পারবে না। দুটি স্থানেই অভিযান চালিয়ে দ্রুত অপতৎপরতা বন্ধ করবেন।

মন্তব্য করুন