চট্টগ্রাম ছেড়ে গ্রামমুখী লাখো মানুষ

নগরের মোড়ে মোড়ে ঝুলছে 'টু-লেট'

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম ছেড়ে গ্রামমুখী লাখো মানুষ

করোনায় বিপন্ন জীবন। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া ভালো নেই কেউই। চাকরি হারিয়ে অনেকেই আছেন আর্থিক কষ্টে। তাই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছেন শত শত মানুষ। আগে শুধু বাসার সামনে ঝুলানো থাকলেও বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর মোড়ে মোড়ে মিলছে অসংখ্য 'টু-লেট'- মো. রাশেদ

আকাশ মিত্র। বেল বয়ের কাজ করছেন চট্টগ্রাম নগরের চার তারকা মানের নতুন হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্নে। মাত্র আট হাজার টাকা বেতন তার। কিন্তু করোনার কারণে চার তারকা মানের এই হোটেলই তার বেতন বকেয়া রেখেছে চার মাস ধরে। আফসানা বেগম। সুইং অপারেটরের কাজ করতেন সাগরিকার মাহের গার্মেন্টসে। করোনাকালে ঝুঁকির মধ্যেও কাজ করে গেছেন। গত মাসে আফসানাসহ দুই শতাধিক শ্রমিককে ছাঁটাই নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। উপায়ান্তর না দেখে শহরের বাসা ছেড়ে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আফসানা ও আকাশ মিত্ররা। শুধু আফসানারা নন; করোনার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ছাড়ছেন অন্তত লাখো মানুষ। তাই শহরের অলিতে-গলিতে ঝুলছে এখন শত শত 'টু-লেট' নোটিশ।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় করোনাকালের চার মাসে চাকরি হারিয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। তাদের মধ্যে নিম্নবিত্ত যেমন আছে, তেমনি আছে মধ্যবিত্তও। ক্যাবের জরিপ অনুযায়ী চট্টগ্রাম মহানগরীর ৬০ লাখ বাসিন্দার ৯০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। এখন যারা গ্রামে ফিরছেন তাদের কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ-বা করোনায় হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। ব্যবসা করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেওয়া পরিবারও আছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক।

ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে করোনা। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউই এখন ভালো নেই। আবার করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্তও বেশি হয়েছেন এই দুই শ্রেণির মানুষ। আবার এদের ভালো না থাকার প্রভাব পড়েছে কোনো কোনো উচ্চবিত্তের ওপর। যারা বাড়ির মালিক, তাদের একের পর এক ফ্ল্যাট ছাড়ছে এরা। এর প্রভাবে জীবনযাত্রা পাল্টে যাচ্ছে তাদেরও।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরের মোড়ে মোড়ে এখন ঝুলছে 'টু-লেট' নোটিশ। কেউ বাসা ভাড়া দেওয়ার নোটিশ দিয়েছেন। কেউ-বা দোকানঘর ভাড়া দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আগে এমন নোটিশ সংশ্নিষ্ট বাসা বা দোকানের ওপর ঝোলানো হতো। কিন্তু এখন শহরের মোড়ে মোড়ে ঝোলানো হচ্ছে টু-লেট। আবাসিক এলাকার টু-লেট গলির মুখেও ঝোলাচ্ছেন বাড়ির মালিকরা। গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকার শতাধিক বাসার মধ্যে এখন ৩০ শতাংশই খালি বলে জানিয়েছেন সমিতির নেতারা। শ্যামলী আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখেও টু-লেট নোটিশ আছে অন্তত দুই ডজন। সিডিএ আবাসিক এলাকার বিভিন্ন লেনে ঝুলতে দেখা গেছে শত শত 'টু-লেট'। মার্কেটে মার্কেটে ঝুলতে দেখা গেছে দোকান বিক্রি কিংবা খালি হওয়ার নোটিশ। লাকি প্লাজার বিভিন্ন তলায় এমন নোটিশ আছে অর্ধশত। সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক মার্কেট, সেন্ট্রাল প্লাজা ও আখতারুজ্জামান সেন্টারে এমন টু-লেট ও ক্রয়-বিক্রয়ের নোটিশ আছে শতাধিক।

চাকরি হারিয়ে শহর ছাড়তে যাওয়া আফসানা বেগম বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি হারিয়েছি। দুই সন্তান এখানকার স্কুলে পড়ে। কিন্তু আর এক সপ্তাহও চট্টগ্রামে থাকার মতো অবস্থা নেই আমার। তাই ঈদের আগেই একেবারে ছেড়ে দেবো বাসা। ফিরে যাব গ্রামে।' হালিশহর এলাকার বাসিন্দা বয়োবৃদ্ধ হেফাজত মিয়াও ছাড়ছেন শহর। কারণ জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, 'সাত সদস্যের পরিবার আমার। একমাত্র ছেলে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে মাসখানেক আগে। সে যা আয় করত তা দিয়েই চলতাম আমরা। কিন্তু এখন আর বাসা ভাড়া দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই সবাইকে নিয়ে গ্রামে চলে যাব এই মাসের মধ্যে।