কমছে উপসচিবদের গাড়ি সুবিধা

করোনায় ব্যয় সংকোচন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০

দেলওয়ার হোসেন

করোনাকালীন সংকটে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে উপসচিবদের গাড়ি সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। সংশোধিত নীতিমালা অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন। অর্থ বিভাগের অনুমোদন পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা কার্যকর করা হবে।

এতে উপসচিবের সঙ্গে বেতন গ্রেডের ভিত্তিতে সমপদমর্যাদার দাবিদার বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণের দীর্ঘদিনের দাবিও অবসান হবে। কমবে সচিবালয়সহ ঢাকা শহরের যানজট।

সম্প্রতি সরকারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। বৈঠকে বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তারা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ করেন। প্রসঙ্গত, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের প্রায় সব কর্মকর্তা উপসচিবদের মতো গাড়ি সুবিধা চেয়ে জনপ্রশাসনে আবেদন করেছিলেন।

উল্লেখ্য, প্রশাসন ক্যাডারের মতো সব ক্যাডারের উপসচিব পর্যায়ের বা পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দিতে হলে প্রায় অর্ধলাখ কর্মকর্তাকে এ ঋণ দিতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নন-ক্যাডার পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মতো অনেক কর্মকর্তাও একই দাবি জানিয়েছেন। সবাইকে এ সুবিধা দিলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সরকারের আয় কমে গেছে, বেড়েছে ব্যয়। তা ছাড়া এত গাড়ি কেনা হলে ঢাকা শহরে সৃষ্টি হবে ভয়াবহ যানজট। এমন প্রেক্ষাপটে উপসচিবদের পদোন্নতি পাওয়ার তিন বছর আগে সুদমুক্ত গাড়ির ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। আগে পদোন্নতি পাওয়ার পরদিন থেকেই এই সুবিধা পেতেন তারা। এজন্য গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা সংশোধন করছে জনপ্রশাসন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন সমকালকে বলেন, উপসচিব হলেই গাড়ি সুবিধা পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। সরকারের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকারের আয় কমে গেছে, আর ব্যয় বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রচুর বরাদ্দ দিতে হয়েছে। এজন্য গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা কঠিন করা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, উপসচিব পদে পদোন্নতির তিন বছর আগে আর বিনা সুদে গাড়ির ঋণ দেওয়া হবে না। নীতিমালা সংশোধনের জন্য অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। অর্থ বিভাগের অনুমোদন পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশোধিত নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

২০১১ সালের ১৫ মার্চ প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। নীতিমালা অনুসারে সরকারের যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ দেওয়ার কাজ শুরু হয়। পরে নীতিমালাটিতে নানা পরিবর্তন ও সংযোজন আনা হয়। ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে সরকারের উপসচিবদের সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার দিয়ে নীতিমালায় সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আওতায় উপসচিবরা গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে এককালীন ৩০ লাখ টাকা ঋণ এবং গাড়ি পরিচালনার জন্য মাসে ভাতা ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছেন।

আইন ও বিচার বিভাগ সচিব মো. গোলাম সারওয়ার বলেন, কর্মকর্তাদের যে কোনো সুবিধা সরকারের যেমন দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তেমন বাতিল করারও ক্ষমতা আছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো সুবিধা দিতে না পারলে সরকার অবশ্যই তা বাতিল করতে পারবে।

প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র সহকারী সচিব পদের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। এসব কর্মকর্তাদের অনেকে জানিয়েছেন, এ সুবিধা কমানো হলে কর্মকর্তাদের মনে হতাশা সৃষ্টি হবে। কারণ, আগের ব্যাচের সবাই এ সুবিধা পেয়েছেন। এখন জুনিয়র কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হবে। তারা এ সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

দেশে ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে ২৬টি। এসবের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ৭৫ শতাংশ এবং অন্য ২৫ ক্যাডার থেকে ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। অবশিষ্ট কর্মকর্তারা উপসচিব না হয়ে তাদের ক্যাডারের লাইন পদে থেকে যান। তবে অন্যান্য ক্যাডারের ২৫ শতাংশ কর্মকর্তাকে উপসচিব করা নিয়েও অনেক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু উপসচিবদের সার্বক্ষণিক গাড়ির প্রাধিকার দেওয়ার পর বিক্ষুব্ধ হয়ে আছেন ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া সচিবালয়ে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র এক হাজার গাড়ির। কিন্তু গাড়ি প্রবেশের পাস দেওয়া আছে সাড়ে ছয় হাজার। ফলে ৫০০ থেকে ৬০০ যুগ্ম সচিবের গাড়ি পাশের আবেদন জমা আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। উপসচিবদের গাড়ি সুবিধা কমানো হলে সচিবালয়ের যানজটও কমবে।