বিদেশে পর্যটনের সুযোগ মিলছে না বাংলাদেশিদের

আস্থার সংকটে ভিসা বন্ধ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০

রাশেদ মেহেদী

বিদেশে পর্যটনের সুযোগ মিলছে না বাংলাদেশিদের

ফাইল ছবি

কভিড-১৯ মহামারির কারণে লকডাউনে বাসায় থাকতে থাকতে একঘেঁয়ে হয়ে যাওয়া সবার মন আনচান করছে কোথাও বেড়ানোর জন্য। তবে সামর্থ্য থাকলেও অনেক বাংলাদেশি দেশের বাইরে যেতে পারছেন না। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণ এবং এ রোগ বিস্তারের তথ্য নিয়ে সংশয়ের কারণে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের ভ্রমণ ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে।

এশিয়া এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে সীমিত পরিসরে পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলে দিতে শুরু করেছে। এমনকি গত মার্চ-এপ্রিলে কভিড-১৯ রোগে বিপর্যস্ত স্পেন ও ইতালিও বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র সীমিত পরিসরে খুলে দিয়েছে। কভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল চীনও অনেক পর্যটন কেন্দ্র খুলে দিয়েছে। জুনের শুরুতেই ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে ভ্রমণ সুবিধা চালু করেছে থাইল্যান্ড। তবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের এখন পর্যন্ত ভ্রমণ ভিসা দিচ্ছে না তারা। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরও পর্যটনকেন্দ্রগুলো সীমিত পরিসরে খুলে দিয়েছে। সর্বশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৪টি দেশের জন্য ভ্রমণ সুবিধা পুনর্বহাল করেছে। সে তালিকায়ও বাংলাদেশ নেই।

পর্যটন ব্যবসা-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কমা এবং পরীক্ষা ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আস্থার জায়গা প্রতিষ্ঠিত না হলে এদেশের নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি মিলবে না।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী সমকালকে বলেন, বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই এখন পর্যটন খাত বিপর্যস্ত। অনেকে দেশ পর্যটন কেন্দ্র সীমিত পরিসরে খুলে দিয়ে আবারও বন্ধও করেছে। আর বাংলাদেশে এখনও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় এ মুহূর্তে বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের পর্যটনের কোনো সুযোগ থাকবে না। এ অবস্থা থেকে চট করে উত্তরণ ঘটবে- সেটিও কেউই আশা করছেন না।

দেশের শীর্ষস্থানীয় দু'জন পর্যটন ব্যবসায়ী বলেন, এমনিতেই বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এ কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ রেখেছে। সংক্রমণ একেবারে কমে না এলে ভিসা উন্মুক্ত হবে না। তার চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের কভিড-১৯ পরীক্ষা ও অবস্থা সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের বিষয়ে আস্থার ঘাটতি।

একজন ব্যবসায়ী উদাহরণ দিয়ে বলেন, জুনের শুরুতে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর অন্যান্য দেশের জন্য পর্যটন কেন্দ্র সীমিত পরিসরে খুলে দিলে তারা ওই দুই দেশের পর্যটন ব্যবসায়ী এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা রাখঢাক না করেই বলে দেন যে, দৈনিক সংক্রমণ একশ'র নিচে না নামলে ভ্রমণ ভিসা ইস্যু করার প্রশ্নই ওঠে না। তা ছাড়া বিপুল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে সামান্য সংখ্যক পরীক্ষার কারণে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র কিনা তা নিয়েও তাদের মধ্যে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশে পরীক্ষা করা নিয়ে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান সে সম্পর্কেও তারা খোঁজ-খবর রাখছেন। ফলে এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিলে তা ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তারা কড়া শর্ত দিচ্ছে। যেমন থাইল্যান্ড এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮৫ লাখ টাকার স্বাস্থ্য বীমার কাগজপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে ফলে ভিসা দেওয়া শুরু হলেও আগের মতো সহজে ভিসার আবেদন করা যাবে না। এ কারণে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ ভিসা কবে উন্মুক্ত হবে তা বলা যাচ্ছে না। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, পরীক্ষা ও তথ্য প্রকাশ নিয়ে এই আস্থার সংকটের কারণে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর পরের কথা, বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য চলতি বছর নেপাল কিংবা ভুটানে ভ্রমণের অনুমতি মিলবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তিনি জানান, নেপালে খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পেরেছেন সে দেশের কর্তৃপক্ষ এভারেস্ট পর্বত আরোহণ বন্ধ রাখলেও কাঠমান্ডু ও পোখরার পর্যটনকেন্দ্রগুলো সীমিত পরিসরে কয়েকটি দেশের জন্য খুলে দিতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা যে ভ্রমণের অনুমতি পাবেন না, তা প্রায় নিশ্চিত।

ভারতের সংবাদ প্রতিদিন ও দ্য হিন্দুসহ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, দেশটিতে করোনা সংক্রমণে এখনও ঊর্ধ্বগতি থাকলেও গত বৃহস্পতিবার থেকে গোয়া সৈকত স্থানীয় পর্যটকদের জন্য সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একইভাবে চারধাম, মন্দারমনি, দার্জিলিং এবং শিলিগুঁড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো এ সপ্তাহের মধ্যেই খুলে দেওয়া হবে। তবে বিদেশের পর্যটকদের জন্য এ সুবিধা এখনই উন্মুক্ত হচ্ছে না।

বাংলাদেশে ১ জুলাই থেকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে শুধু কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা কক্সবাজার এখন পর্যন্ত রেড জোন। কক্সবাজারের পরই আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামেও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্বাভাবিক পর্যটন কবে শুরু হবে কেউ বলতে পারছেন না। পর্যটন ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ- দেশের মানুষকে আরও দীর্ঘ সময় ভ্রমণের ইচ্ছা মনের মধ্যেই চেপে রাখতে হবে।