কাজ হারিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন তারা

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০

ইন্দ্রজিৎ সরকার

কাজ হারিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন তারা

বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে কৃষিতে উদ্যোগী হচ্ছেন অনেক তরুণ । ছবি : সংগৃহীত

'লাইট হাউস ইন্টারন্যাশনাল' নামে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন মিজানুর রহমান সানি। রাজধানীর কলাবাগানে তাদের কার্যালয়। আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানে কিছুটা সংকট ছিল, করোনাকালে তা প্রকট হয়ে ওঠে। বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি ছেড়ে দেন সানি। ফিরে যান রাজশাহীর গোদাগাড়িতে গ্রামের বাড়ি। করোনা পরিস্থিতির উন্নতির আশা করলেও বাস্তবে তা হয়নি। তার ওপর নির্ভর করে আছে পরিবার। বাধ্য হয়ে তিনি বিকল্প ভাবতে শুরু করেন। গড়ে তোলেন অর্গানিক কৃষিপণ্য সরবরাহের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম 'ম্যাংগো ভ্যালি'। আমের মৌসুম হওয়ায় তিনি রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাসায়নিকমুক্ত আম সরবরাহ দিয়েই শুরু করেন। পাশাপাশি অনলাইনে স্মার্টওয়াচ, হেডফোন ও ব্রেসলেটের মতো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট বিক্রির জন্য চালু করেন 'মর্স কোড'। আর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য খোলেন আরেকটি প্রতিষ্ঠান 'টিআর নেটওয়ার্ক'। তার এসব উদ্যোগ থেকে এখনও খুব বেশি আয় হচ্ছে না। তবে তিনি আশাবাদী, সফলতা আসবেই।

করোনাকালে দেশজুড়ে তৈরি হচ্ছে এমন অসংখ্য আশার গল্প। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চাকরি হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়া তরুণ-তরুণীরা এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। নতুন করে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই সাহস নিয়ে তারা নিচ্ছেন নানা উদ্যোগ। কেউ যেমন অনলাইনে ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করছেন, তেমনি অনেকে কৃষিতেও মনোযোগী হয়েছেন। কারও পৈতৃক জমি আছে, কেউ লিজ নিয়ে শুরু করছেন। বাজারে চাহিদা আছে- এমন উচ্চমূল্যের ফল-ফসলের চাষ শুরু করেছেন তারা। এসব উদ্যোগ সফল হলে তাদের সংকট যেমন কেটে যাবে, তেমনি নতুন করে কর্মসংস্থান হবে বহু মানুষের।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের মিডিয়া অ্যাডভোকেসি অফিসার সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন সমকালকে বলেন, 'করোনা-উত্তর নতুন বাংলাদেশের জন্য এটা বিশাল সুখবর। তরুণ-তরুণীদের এসব উদ্যোগ টেকসই করতে সরকারি সহায়তা দরকার। ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার পদ্ধতি সহজ করতে হবে, কমাতে হবে ফি। যে বোনটি ঘরে বসে নকশীকাঁথা বা এ জাতীয় পণ্য তৈরি ও বিপণন করবেন, তার ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অফিস দরকার হবে কেন? প্রয়োজনে কিছু শর্ত বেঁধে অনলাইন ব্যবসার জন্য আলাদাভাবে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। এতে সবকিছু বৈধভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে। যারা গ্রামে ফিরে কৃষি বা অন্যান্য খাতে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাদের সেখানেই প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, ঋণ ও পণ্য বিপণনে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে উদ্যোগগুলোকে সফলতার বন্দরে পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।'

চাকরি হারিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া তরুণরা বলছেন, বর্তমান সংকট পাড়ি দেওয়ার চিন্তা মাথায় রেখে কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে তারা আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠছেন। এই উদ্যোগে সফলতা এলে ভবিষ্যতে আর চাকরির চেষ্টা করবেন না। করোনার শুরুতেই বিপদগ্রস্ত হয়ে যারা নতুন কিছু ভেবেছেন, তাদের অনেকে এরই মধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছেন। তেমনই একজন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ডুবাইল গ্রামের শেখ মো. কামাল হোসেন। তিনি সমকালকে জানান, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের সাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। উত্তরায় হেড অফিস হলেও কাজের প্রয়োজনে তিনি থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। করোনাকালের শুরুতেই তার প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কাজ না থাকায় তারা বেতনও দিতে পারছিল না। ফলে গ্রামে ফিরে যান কামাল। সেখানে ২৫ শতাংশ জমিতে তার বাড়ি। বিশেষ কিছু না ভেবেই তিনি বাড়ির একাংশে অর্ধশত পেঁপের চারা লাগিয়ে দেন। তিন মাসেই সেসব গাছ যথেষ্ট বড় হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে ফুল এসেছে গাছে। সব ঠিক থাকলে ভালো ফলন পাবেন বলে আশা করছেন। দুঃসময়ে এই ছোট্ট সাফল্য তাকে উদ্যোক্তা হওয়ার আশা জোগাচ্ছে। তিনি স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করে সমন্বিতভাবে বড় পরিসরে ফল-ফসল চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করছেন, চাকরির চেয়ে অনেক বেশি অর্থ তিনি আয় করতে পারবেন। সেসঙ্গে থাকতে পারবেন নিজের গ্রামেই।

চাকরি হারানো বা হারানোর ঝুঁকিতে থাকা অনেকেই এখন কৃষি উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি পর্বে আছেন। তাদেরই একজন আখলাক-ই-ওমর পিঞ্জর। তিনি বগুড়া সদরের বেতগাড়ীতে একটি এনজিও কার্যালয়ে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো তার প্রতিষ্ঠানেও সংকট দেখা দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে কর্মীদের ছাঁটাই বা সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে। তার অফিসে তিনিসহ দু'জন এই তালিকায় পড়েছেন। আরেক শাখায় বাদ পড়েছেন ছয়জন। ৪০ বছর ধরে কাজ করেন এমন একজনকে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পিঞ্জর ফিরেছেন তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুরে। সেখানে লাভজনক ফসল চাষাবাদের পরিকল্পনা করছেন।